কুশল চক্রবর্তী
ভারত সরকার ২০১২ সালের ভোক্তা মূল্য সুচক বা কন্সিউমার প্রাইস ইনডেক্সে পরিবর্তন আনতে চলেছে। ভালো কথা। কারণ, সময়ের সঙ্গে মানুষের বিভিন্ন জিনিসের চাহিদার প্রতি যে পরিবর্তন ঘটে তাকে প্রাধান্য দিয়ে এটা করার দরকারও আছে। সরকার বলছে, এই পরিবর্তন আনা হবে ২০২৪ সালের দামের নিরিখে। এই ভোক্তা মূল্য সুচক কিন্তু যে কোনও দেশের আমজনতার পক্ষে এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিস। মানুষের দৈনন্দিন জীবন চালানোর উপর এর বিশেষ প্রভাব আছে। একদিকে যেমন দেশের কোটি কোটি মানুষের আয় ব্যয় এর উপর নির্ভর করে তেমনই ব্যবসা বাণিজ্যের ধারাও এর উপর ভরসা করে।
এবারের এই যে কন্সিউমার প্রাইস ইনডেক্স বা ভোক্তা মূল্য সুচক গঠিত হচ্ছে তাতে কমে যাচ্ছে খাদ্যশস্যের দামের প্রভাব। বিগত ইনডেক্সে খাদ্যশস্যের দামের প্রভাব ছিল ৪৬%, এবার তা কমে হচ্ছে ৪০%। অর্থাৎ কিনা খাদ্যশস্যের দাম বাড়লে তাতে এই সুচকের খুব একটা হেরফের হবে না। এই সূচকের হেরফের হবে ওটিটি চ্যানেলের প্রদেয় অর্থ বাড়লে, মুঠোফোনের জন্য খরচা বাড়লে, ঘরের বাইরের খেতে গেলে খরচের পরিমাণ বাড়লে বা অ্যাপের মাধ্যমে যে সব গাড়ি ভাড়া করা হয় তাদের দামের হেরফের হলে। এগুলো যে ধর্তব্যের মধ্যে আনার একবারেই প্রয়োজন নেই তা হয়তো মানুষ বলবে না, কিন্তু ভারতের আপামর মানুষের কথা ভাবলে মনে করা যেতেই পারে খাদ্যশস্যের মূল্যের পরিবর্তনকে আনেক বেশী গুরুত্ব দেওয়ার দরকার এখনও অবশ্যই আছে। অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিয়ত দেশীয় অর্থনীতির “দারুণ” উন্নতির প্রচারে হয়তো দরকার ছিল “যে বড়লোকেরা তাদের আয়ের কম অংশই খাবারের জন্য ব্যয় করে” একথা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা। তার জন্যই হয়তো ৮০ কোটি লোককে সরকার যে বিনামূল্যে চাল গম সরবরাহ করে তা পুরোপুরি এই সুচকের আওতা থেকে সরিয়ে রাখার প্রয়াস করা হল।
এবারের ভোক্তামূল্য সুচক তৈরি করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার অনেক বেশী পরিমাণ জিনিসের দরদাম এই সুচকে ঢুকিয়েছে। অর্থাৎ কিনা আগে ২৯৯ টি জিনিসের দামের পরিবর্তনে এই সুচকের পরিবর্তন হত, এখন এই মূল্যসুচকের পরিবর্তন ঘটবে ৩৫০টি জিনিসের দামের পরিবর্তনের প্রভাবে। দেখুন এই যে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জিনিসের দামের প্রভাব এখানে ধরা হলো, তার প্রভাব ভারতের কত লোকের উপর ফেলবে? পরিসংখ্যান বলছে এখনও ১৪ কোটি মানুষও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের গ্রাহক নয়। অন্যদিকে যে দেশে কেন্দ্রীয় সরকারকে ৮০ কোটি লোককে বিনামূল্যের চাল গম বিতরন করতে হয়, তাদের খাদ্যদ্রব্যের চাহিদার প্রতিফলন ঘটার কী হলো।
এই মূল্য সূচকে তেমন প্রভাব পরবে না আলু, টম্যাটো, পেঁয়াজের দাম বাড়লে। এখানেও কি একটা নির্বাচনী বৈতরণী পার হওবার ব্যাপার এসে যাচ্ছে না? কারণ ভারতীয় নির্বাচনের ইতিহাস বলে, যে যে সরকারের আমলে পেঁয়াজের দাম বাড়ত তার পক্ষে নির্বাচনে জেতা মুশকিল হতো। সেই ব্যাপারটাকেই প্রায় সরিয়ে দেওয়া হলো। অন্য দিকে গ্রামের বাড়ি ভাঁড়ার ওঠা-নামাকে যে সুচকের মধ্যে আনা হলো সে চিন্তাকে সাধুবাদ জানালেও একথা বলতেই হয় তার সঠিক মূল্যায়ন করার উপায় আছে কি? কারণ, এখনও গ্রামীণ বাড়ি ভাঁড়ার ব্যাপারটা তেমন ভাবে সংগঠিত উপায়ে হয় বলে তো মনে হয় না। তার ফলে সে ব্যাপারে সঠিক তথ্য পাওয়া খুবই
কঠিন। তাই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অরুন কুমার বলেছেন, “গন বণ্টন ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যে খাদ্যশস্য বিতরিত হয় তার হিসাবে এই সূচকে না থাকলে প্রকৃত মুদ্রাস্ফীতি বোঝা হয়তো সম্ভব নয়”। দেখা যাক ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে এই ভোক্তা সুচক প্রকাশিত হলে কার বেশী সুবিধা হয়।












1 thought on “নতুন কন্সিউমার প্রাইস ইনডেক্স কার সুবিধা করে দেয়”