কুশল চক্রবর্তী
এশিয়ার একটা বিরাট অংশ জুড়ে চলেছে যুদ্ধের হানাহানি। সারা বিশ্বের এক বড় অংশের লোক জীবন ও জীবিকা নিয়ে প্রবলভাবে চিন্তায়। ভারতের মতো নানা দেশে জ্বালানি নিয়ে সংকট। জ্বালানির অভাবে নানা লোকের জীবিকায় ছেদ। সবাই যখন এই চিন্তায় ব্যস্ত, তখন আদানি এন্টারপ্রাইজ ঠিক জেপি গ্রুপের ধুঁকতে থাকা কোম্পনিগুলোর (Jaypee Associates) মালিক হয়ে বসল ট্রাইবুনালের নির্দেশে। ডুবল লক্ষ লক্ষ জেপি এসোসিয়েটের শেয়ারে লগ্নি করা বিনিয়োগকারীর টাকা আর শয়ে শয়ে কোটি টাকা জলে গেল এই কোম্পানিকে এক সময় ধার দেওয়া একাধিক ব্যাঙ্কগুলোর। আর আদানি গ্রুপ কত টাকা লাভ করল? তা ধীরে ধীরে বলছি।
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত Jaypee Associates ছিল এক বিশাল কোম্পানি। তার ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বাড়ি বানানো, হোটেলের ব্যবসা। উত্তর প্রদেশেরে নয়ড়ায় ছিল এই কোম্পানির প্রধান কার্যালয়। অর্থের সঠিক যোগানের ব্যবস্থা না করে নানা ধরনের ব্যবসায় লগ্নি করার ফলে এই কোম্পানি বিপদে পড়ে। এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, কোম্পানির মালিকরা আর কোম্পানি চালাবার মতো টাকা জোগাড় করতে পারছিলেন না। অবশেষে দেউলিয়া হওয়ার দিকে তাঁরা এগোয়।
ATM-কে আরও নিরাপদ করার কথা ভাবছে RBI, উঠছে একাধিক প্রশ্ন
এই কোম্পনিকে কেনার জন্য এগিয়ে আসে একাধিক সংস্থা। কারণ, দেউলিয়া কোম্পানির আইনের আওতায় এই কোম্পানি তখন সরকার নিযুক্ত বোর্ডের আওতায় এসে গিয়েছে। শোনা যায় একসময় বেদান্ত গ্রুপ এই কোম্পানিকে ১৭,০০০ কোটি টাকায় প্রায় কিনতে যাচ্ছিল। এমনকী ডালমিয়া ভারত কোম্পানিও ছিল এই জেপি এসোসিয়েটস কেনার দৌড়ে।
কিন্তু তা আর হয় না। অবশেষে আদানি গ্রুপ, এই কোম্পানিকে অনেক কম, ১৪,৫৩৫ কোটি টাকায় কিনে নেওয়ার অধিকার পায়। সবাইকে সরিয়ে রেখে আদানি গ্রুপই বাজিমাত করে। শুধু কি টাকার জোরেই আসে এই জয়? এই জয়ের পিছনে যেমন ছিল আদানি গোষ্ঠীর ৬০০০ কোটি টাকা নগদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, তেমনই NARCL-র সমর্থন। এর সঙ্গে ছিল কমিটি অফ ক্রেডিটারেরও সমর্থন। বেদান্ত গ্রুপ কিন্তু এককালীন টাকাটা কিছু কম দেওয়ার কথা বলেছিল, আর বলেছিল পাঁচ বছরে বাদবাকি টাকা ধাপে ধাপে শোধ করবে। এখন এই যে NARCL, যারা কিনা দেউলিয়া ঘোষিত কোম্পানিগুলোর সম্পত্তির পুনর্গঠন করে, তাদের কাছে নাকি নগদ বা তাৎক্ষণিক টাকার অনেক বেশী মূল্য! তাই তারা বেছে নেয় আদানি গ্রুপের প্রস্তাবকে।
আসুন দেখা যাক এর ফলে কীভাবে, লাভবান হলো আদানি গোষ্ঠী আর ক্ষতিগ্রস্ত হলো ৬.৪৫ লক্ষ জেপি এসোসিয়েটসের শেয়ার লগ্নিকারী আপামর জনতা। আর অসংখ্য জেপি এসোসিয়েটের ফ্ল্যাট বুক করা লোকেরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল।
এই অধিকারের ফলে আদানি গ্রুপ পেল উত্তরপ্রদেশে আর মধ্যপ্রদেশে দুটো সিমেন্ট কারখানা। তাতে সুবিধা হবে তাদের অম্বুজা সিমেন্ট কোম্পানির সিমেন্ট উৎপাদন বাড়াতে। আরেকটি বড় লাভ হয়েছে জেপি এসোসিয়েটের দিল্লির কাছে ৩৯৮৫ একরের মতো মূল্যবান জমির অধিকার পাওয়া। এর সঙ্গে দখলে এল দিল্লি, মুসৌরি আর আগ্রায় পাঁচটা বিলাসবহুল হোটেলের মালিকানা। সর্বোপরি হাতে এল জেপি এসোসিয়েটের বাণিজ্যিক অফিসগুলো। তারও দাম কিন্তু কম নয়।
১,৭২,০০,০০,০০,০০০ টাকা, ব্যাঙ্ক ঋণ মকুবের পালা চলেছেই
এখন একটা ব্যাপার অবাক করছে যে, কেন এই NCLT বা NARCL-এর মতো আধা সরকারি সংস্থাগুলো আদানি গোষ্ঠীকে উপযুক্ত বলে বোধ করছে? হয়তো তার পিছনে কোনও কারণ আছে। কিন্তু এবারেও কিন্তু বেদান্ত গোষ্ঠী এই রায়কে স্বচ্ছ বলে মানতে রাজি হয়নি। এমনকী তারা উচ্চতম আদালতে যাওয়ার কথাও বলেছে। সবচেয়ে অবাক হওয়ার মতো কথা হচ্ছে, নিন্দুকেরা বিগত ১২ বা ১৩ বছরে আদানি গোষ্ঠীর সম্পদ যে ৪৭ হাজার কোটি টাকা থেকে ২.৭১ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছে গিয়েছে, তা নিয়ে আঙুল তুলছে তাতে অবাক হওয়া কারণ থাকছে কি? সর্বোপরি দেখুন, এই জেপি এসোসিয়েট নিয়ে কেসটা চলছিল অনেক দিন ধরেই। পরিশেষে বিচারের নিষ্পত্তি ঘোষিত হলো ১৭ মার্চ ২০২৬-এ। এই ১৭ নম্বরটা এই ভারতের এক “মহা মানবের” খুবই প্রিয় সংখ্যা। তাই কি ওই দিনটাতেই এই রকম সিদ্ধান্ত
এল?

