কুশল চক্রবর্তী
একটু হলেও ব্যতিক্রমীভাবেই ২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হলো পার্লামেন্টে রবিবার। নবমবারের জন্য মাননীয়া অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এই বাজেট পেশ করতে গিয়ে সামগ্রিকভাবে পরিকাঠামো উন্নয়ন আর তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের দিকে জোর দিয়েছেন (Budget 2026)। জিডিপির ৪.৩% ঘাটতি বাজেটে সকলকে হয়তো খুশি করা যায়নি, তবে কিছু দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার দিশা তিনি বাজেটে রেখেছেন। মাননীয়া অর্থমন্ত্রী তাঁর ৮৫ মিনিটের বাজেট বক্তৃতায় করের কথা বলেছেন কম, পরিকল্পনার কথা বলেছেন বেশী। আমজনতা হয়তো কিছুটা হতাশ হয়েছে। কারণ তাদের আশায় জল ঢেলে তিনি আয়করে ছাড়ের কথা বলেননি, বরং শেয়ারের ফিউচার আর অপশনের উপর অধিক কর ধার্য করে, শেয়ার সূচককে আপাতভাবে নিম্নগামী করেছেন। বিদেশী বিনিয়োগের আশায় তিনি নানা রকম সুযোগ সুবিধার কথা ঘোষণা করেছেন, যেমন ডাটা সেন্টার বানালে ২০৪৭ সাল অবধি কর মুকুব করার কথা বলেছেন।
Budget 2026: দেখা যাক আমজনতারা কী পেল বা তাদের গেল
এই বাজেটে মাননীয়া অর্থমন্ত্রীর পদক্ষেপে দাম কমবে ১৭টি ক্যান্সারের ওষুধ, সমুদ্রজাত খাবার, স্মার্টফোন, ইভি ব্যাটারি, খেলার সরঞ্জাম, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, সোলার প্যানেল আর কিছু ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর। অন্য দিকে দাম বাড়বে মদ ,তামাকজাত জিনিস যেমন সিগারেট, গুটখা ইত্যাদির। সঙ্গে রয়েছে সিডি, ডিজিটাল ক্যামেরা, কফি, ছাতা, ভিডিয়ো গেমসের মতো জিনিসের।
দাম বাড়ছে সিগারেটের, বাজেটে সস্তা হলো কী কী? রইল তালিকা
প্রাথমিক ভাবে দেখতে গেলে মনে হতে পারে এই বাজেট তা হলে তেমন চিত্তাকর্ষক বাজেট হয়তো নয়। কারণ, আমজনতা তাৎক্ষনিক সুখ সুবিধা নিয়েই ভাবতে ভালোবাসে। কিন্তু দেখুন এই বাজেটে, ভারতবর্ষের প্রায় ১৫ কোটি সিনিয়র সিটিজেনের বিষয়ে কিছুই ভাবা হয়নি। রেলের সুযোগ সুবিধা থেকে হাসপাতালে চিকিৎসার পরের খরচের যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, যা কিনা এই বৃদ্ধ মানুষদের বহন করতে হয়, তা নিয়ে সরকার বাহদুরের কোনও চিন্তার প্রকাশ এই বাজেটে ঘটেনি। বরং এখন অনেক সিনিয়র সিটিজেনের প্রয়োজনীয় ডায়াপারের দামও বাড়বার পথ করে দেওয়া হয়েছে।
ভারতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখতে পাবেন অর্থনীতির বাজেটের সঙ্গে রাজনীতির এক অদ্ভুত ভালোবাসা। গতবারের কেন্দ্রীয় বাজেটে বরাদ্দ হয়েছিল বিহারের পরিকাঠামো উন্নয়ন, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও আরও কিছুর জন্য প্রায় ৩০০০০ কোটির মত টাকা। নিন্দুকেরা বলে এটা নাকি ছিল সেবারের বিহারের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের দরাজ হস্ত। অবাক ব্যাপার, এবারের বাজেটে মাননীয়া অর্থমন্ত্রী কিন্তু কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ বা অসমের নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে কোনও রাজ্যকেই কিন্তু এমন কিছু দেননি। অবশ্যই শিলিগুড়ি থেকে বারাণসীর হাই স্পিড ট্রেন হয়তো ব্যাতিক্রম।
জুড়ল বাংলা-গুজরাট, ৭ হাই স্পিড রেল করিডরের ঘোষণা নির্মলা সীতারামনের
অন্য দিকে সরকার বাহদুর এবারের বাজেটে যে ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা মূলধনী ব্যায়ের কথা বলেছেন তার প্রকৃত ব্যবহার হলে তা কিন্তু অর্থনীতির পক্ষে ভালোই হবে। অন্যদিকে ছোট শিল্প আর মাঝারি শিল্পে সরকার যে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলেছে তাতে হয়তো কর্ম সংস্থানের একটা সুযোগ ঘটতে পারে। বিগত বছরগুলোর বাজেটের ইচ্ছা আর ফল নিয়ে যদি একটু চিন্তা করেন তাতে কিন্তু হতাশই হতে হবে।
১৯৭৫ সালে কংগ্রেসের হয়ে বাজেট পেশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী সি সুব্রহ্মনিয়ম। তাতে ছিল খাদ্য আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর জোর, ছিল কৃষি আর পেট্রলিয়ামজাত শিল্পের উন্নয়নের জন্য নান উৎসাহ প্রদানের চেষ্টা। কিছু করের বোঝাও বাড়ানো হয়েছিল। তাতেও তৎকালীন জনসংঘের সভাপতি লালকৃষ্ণ আডবানি বলেছিলেন, ‘এই বাজেট নিষ্ঠুর আর নির্যাতনমূলক বাজেট। সকল জিনিস যা কিনা সাধারণ মানুষ ব্যবহার করেন, তার উপর নতুন করের প্রভাব পড়বে, শুধু ধনীরা কর বৃদ্ধির আওতায় পড়বে এ কথটা ঠিক নয়।’
‘ভবিষ্যতের রোডম্যাপ’, নির্মলার বাজেটের প্রশংসায় পঞ্চমুখ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী
বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, যে আয়-ব্যায়ের হিসাব অর্থ বছরের প্রথমে দেওয়া হয় তা ঠিক থাকে, কি থাকে না। দেখা যাক, সরকার বাহাদুর তার প্রতিশ্রুতি মতো সরকারের আয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন কিনা। অন্যথায় ঘাটতি বাজেটের নীতি অনুসারে জিনিসের দাম বাড়ার প্রবণতা কিন্তু থাকবেই।

