কুশল চক্রবর্তী
ভারতের দ্বিতীয় সর্ব বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক HDFC Bank-এর শেয়ারের দামের পতন ঘটতে শুরু করেছে বলত গেলে ১৮ মার্চ ২০২৬ সাল থেকে। ওই ব্যাঙ্কের স্বাধীন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মাননীয় অতনু চক্রবর্তী ২০২৬ সালের ১৮ মার্চ ব্যাঙ্কের পদ থেকে সড়ে দাঁড়ানোর সময়ে বলেছিলেন, “ব্যাঙ্কের কিছু কাজ তাঁর মূল্যবোধ ও নীতির পরিপন্থী”। ওঁর পদত্যাগের সময়ে শেয়ারের দাম ছিল ৮৪৩ টাকা, তা এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৭৩০ টাকার আশপাশে।
এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। উঠে এসেছে ব্যাঙ্কের ভিতরের তদন্ত রিপোর্ট। যেখানে পরিষ্কার বলছে মহারাষ্ট্র ষ্টেট রোড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (MRSDC), যা কি না মহারাষ্ট্র সরকারের একটি বিভাগ, তাদের টাকা ব্যাঙ্কের কাছে জমা রাখতে গিয়ে HDFC ব্যাঙ্ক কিছু প্রচলিত আইন বহির্ভূত কাজ করেছে। খুব ছোট কথায় রিপোর্ট বলছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ HDFC ব্যাঙ্ক, ওই দপ্তরের কাছে তাদের টাকা রাখার আবেদন জানায়। ওই দপ্তর বলে, যদি তাদের ৬.০১% সুদ দেওয়া হয় তবে তারা ২৫০০০ কোটি টাকা ওই ব্যাঙ্কে রাখতে পারে। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী HDFC ব্যাঙ্ক তাদের ৩.৫০% বেশী সুদ দিতে পারে না। অতএব তাতে রাজি হয় না মহারাষ্ট্র সরকারের ওই দপ্তর। ওদিকে এত বড় ডিপোজিট হাতছাড়া করতে রাজি নয় HDFC ব্যাঙ্ক। তারা প্রস্তাব দেয়, বাকি ২.৫০% সুদ তারা অন্যভাবে ওই দপ্তরকে দিয়ে দেবে।
আরও পড়ুন: ভারতেও এবার পলিমার মিশ্রিত টাকার নোট?
এরপর দেখা যায় HDFC ব্যাঙ্ক তাদের মার্কেটিং বিভাগের মাধ্যমে ওই দপ্তরকে ৪৫ কোটি টাকা দেয়। কারণ এই দপ্তর “রোড সেফটি সজাগ করার প্রচারের” সময় তারা ব্যাঙ্কের হয়ে প্রচার করেছে, বা এই রোড সেফটি সচেতনতা বিষয়টা জনগনের কাছে এই দপ্তর পৌঁছে দিয়েছে HDFC-র বদান্যতায়। এটাও দেখা যায় যে, তিনটি বিক্রেতার মাধ্যমে এই যে বিলের ৯ কোটি টাকা মেটানো হয়েছে, তাতে ব্যাঙ্কের প্রচারের একই ছবি লাগানো হয়েছে। আর হ্যাঁ, এর মধ্যে এই ব্যাঙ্ক এই অতিরিক্ত সুদ ঘুরপথে MSRDC-কে দেওয়ার জন্য নিজদের মধ্যে নানা মিটিং করেছে। কিন্তু বড় বড় আধিকারিকরা কোনও জায়গায় সই না করে জুনিয়র আধিকারিকদের দিয়ে সই করিয়েছে। কিন্তু টাকাটা ঘুরপথে যাতে মহারাষ্ট্রের ওই দপ্তরের ঘরে যায়, তা কিন্তু HDFC ব্যাঙ্কের লোকেরা নিশ্চিন্ত করেছে।
আরও মজাটা দেখুন, ১৯ মার্চ ২০২৬ সালে এই ব্যাঙ্কের নতুন অন্তর্বর্তী চেয়ারম্যান কেকি মিস্ত্রি পদে আসীন হয়ে বলেন যে, “এই ব্যাঙ্কের নিয়ম নীতি খুব কঠোর আর আমি যদি দেখি কোনওরকম পরিচলনায় ত্রুটি হয়েছে তবে আমি আমার পদ থেকে সড়ে দাঁড়াব। এমনকি রিজার্ভ ব্যাঙ্কও বলে, “সময় সময় আমরা যে এই ব্যাঙ্কের মূল্যায়ন করেছি তাতে এই ব্যাঙ্কের কাজকর্ম নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই”। অথচ দেখুন ২০২২ সাল থেকে যে টাকা ওই দপ্তর ব্যাঙ্কে জমা রাখতে আরম্ভ করেছিল তার ৩.৫% সুদ তারা তাদের অ্যাকাউন্টে দিয়ে দেয়। আর অতিরিক্ত ৪৫ কোটি টাকা তারা পায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে। শুধু তাই নয়, ওই দপ্তর (MSRDC) ২৫০০০ কোটি টাকা মৌখিকভাবে জমা দেবে বলে মাত্র ৩০০০ কোটি টাকা ব্যাঙ্কে রাখে। বলুন এই ব্যাঙ্কের ১২ কোটি গ্রাহকরা কাকে বিশ্বাস করবেন?
আরও পড়ুন: টাকাকে বাঁচাতে সোনা বিক্রি করছে RBI? রিপোর্ট ঘিরে জোর জল্পনা
অন্যদিকে দেখুন, মহারাষ্ট্র সরকারের এই যে MRSDC দপ্তর, একটা সরকারি সংস্থা হয়ে এমন টাকা নিল কী ভাবে? তারা কি জানত না যে ব্যাঙ্কে সাধারণভাবে টাকা রাখলে কত সুদ পাওয়া যায়? কেনই বা তারা সরকারি ব্যাঙ্ক ছেড়ে প্রাইভেট ব্যাঙ্কে টাকা রাখতে গেল? অন্যদিকে দেখুন মাননীয় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালে সরকারি টাকা বেসরকারি ব্যাঙ্কে রাখা যাবে, এ কথা ঘোষণা করার ৬ মাস যেতে না যেতেই এমন ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। আগে যারা কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ছিলেন তাঁরা কি এই সুদুরপ্রসারী কোনও ঘটনার কথা ভেবেই এইরকম সিদ্ধান্ত নিতে অপরাগ ছিলেন?

