পিন্টু ঘোষাল
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী আষাঢ় মাসের ৭ বা ৮ তারিখে সূর্য আর্দ্রা নক্ষত্রে প্রবেশ করে। এই সময় থেকেই বর্ষার সূচনা বলে মনে করা হয়। আর এই সময়ই পালিত হয় ‘অম্বুবাচী’। ‘অম্বুবাচী’ শব্দের অর্থই হলো জলবর্ষণ। সূর্যের আর্দ্রা নক্ষত্রে প্রবেশের পর প্রকৃতি বৃষ্টিসিক্ত হয়ে ওঠে এবং পৃথিবী যেন নতুন প্রাণের স্পর্শ পায়। শাস্ত্রীয় মতে, এই সময় ধরণী প্রথমবারের মতো পুষ্পমতী হন। তাই অম্বুবাচীর পর কৃষকরা জমিতে লাঙল চালিয়ে চাষের কাজ শুরু করেন।
‘আর্দ্রা’ শব্দের অর্থ সিক্ত বা ভেজা। এই নক্ষত্রের নামও তার স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বৈদিক সাহিত্যের তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে আর্দ্রার নাম ‘বাহু’ বা ‘রুদ্রস্য বাহু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্দ্রাকে তুষারশোভিত হিমালয়ের কন্যা ‘হৈমবতী’ বলেও অভিহিত করা হয়। এই নক্ষত্রের অধিদেবতা হলেন রুদ্র। (Ambubachi 2026)
জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আর্দ্রা নক্ষত্র আকাশগঙ্গা বা সুরবীথির পার্শ্বে অবস্থিত। সেখানে কালপুরুষ বা রুদ্রতারা অবস্থান করছে বলে কল্পনা করা হয়। রুদ্রতারার বাহুতে আর্দ্রা, পাশে মৃগশিরা এবং মস্তকে পুনর্বসু নক্ষত্রের অবস্থান। প্রাচীন ঋষিদের কাছে আকাশগঙ্গার এই অংশটি অত্যন্ত মনোরম ও পবিত্র বলে বিবেচিত ছিল। তাঁরা এই দৃশ্যকে দেবত্বের রূপ দিয়ে ধর্ম ও পুরাণশাস্ত্রে স্থান দিয়েছেন।
আকাশে আর্দ্রা নক্ষত্রের মস্তকের কাছে ময়ূরের আকৃতির একটি তারা-সমষ্টি এবং নীচে মোরগের আকৃতির আরেকটি তারা-সমষ্টি দেখা যায়। মাঝখানে অবস্থান করে আর্দ্রা। এই দৃশ্যের অনুপ্রেরণায় মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর ‘দেব্যাঃ স্তুতিঃ’-এর ১৫ নম্বর শ্লোকে দুর্গাদেবীকে কুমার-শক্তিরূপিণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে— “ময়ূরকুক্কুটবৃতে মহাশক্তিধরেহনঘে। কৌমারীরূপসংস্থানে নারায়ণি নমোহস্তু তে।।’’
এর অর্থ, “হে দেবী, আপনি ময়ূর ও কুক্কুট দ্বারা পরিবেষ্টিতা, মহাশক্তিধারিণী, নিত্যশুদ্ধা এবং কুমার-শক্তিরূপিণী। হে নারায়ণী, আপনাকে প্রণাম।” (Ambubachi 2026)
শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় ‘অম্বু’ শব্দের অর্থ জল, আবার ভূমিও। ভূমি অর্থে ধরিত্রী দেবীকে বোঝানো হয়। অন্যদিকে মিথুন রাশির অর্থ মহামিলন। আর্দ্রা নক্ষত্র মিথুন রাশির অন্তর্গত। সূর্য যখন মিথুন রাশির আর্দ্রা নক্ষত্রে অবস্থান করেন, তখন প্রকৃতিতে সৃষ্টির নতুন অধ্যায় শুরু হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। যেমন একটি বীজ জল পেয়ে সিক্ত হলে অঙ্কুরিত হয় এবং পরে সূর্যের তেজে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, তেমনই এই সময় জীবজগৎ, উদ্ভিদ, জলচর ও স্থলচর প্রাণীর মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে বলে মনে করা হয়। ফলে প্রকৃতিতে নবচেতনা এবং নবজীবনের ধারা প্রবাহিত হয়। এই কারণেই অম্বুবাচীর সময় ভূমি কর্ষণ, জলসেচ, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন কৃষিকাজের উপর শাস্ত্রীয় বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এই তিনটি জায়গা থেকে ফেরার সময় ভুলেও পিছনে তাকাবেন না, বাড়তে পারে সমস্যা
অসমের নীলপর্বতে অবস্থিত মহাতীর্থ সতীপীঠ কামাখ্যা মন্দিরে এই অম্বুবাচীকে বিশেষভাবে পালন করা হয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, এখানে দেবী সতীর যোনি পতিত হয়েছিল। যেহেতু নতুন প্রাণের জন্ম যোনির মাধ্যমে হয়, তাই এই স্থানকে সিদ্ধ যোনিপীঠ হিসেবে পূজা করা হয়। অম্বুবাচীর সময় কয়েকদিনের জন্য কামাখ্যা মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। এই উপলক্ষে সেখানে বৃহৎ মেলার আয়োজন হয় এবং বহু সিদ্ধ সাধক ও তান্ত্রিকের সমাগম ঘটে। সাধারণ মানুষের প্রবেশে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধও থাকে। (Ambubachi 2026)
এই সময় মন্ত্রপাঠ, সাধনা, পূজা ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় এক দিব্য সৃষ্টির আশায়। ভারতের ঈশান কোণে অবস্থিত কামাখ্যা পীঠকে শিব তথা পুরুষ এবং দেবী কামাখ্যা অর্থাৎ প্রকৃতির মহামিলনের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। সেই মিলন থেকেই নব সৃষ্টির উদ্ভব ঘটে। তাই অম্বুবাচী শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি প্রকৃতি, সৃষ্টি, উর্বরতা এবং পুরুষ-প্রকৃতির মহামিলনের এক গভীর সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতীক।

