Site icon Hindustan News Point

শবরদের নীলমাধব থেকে বিশ্বজনের জগন্নাথ, রথযাত্রার অন্তরালে এক অনন্য আখ্যান

Nilamadhab to Jagannath

আষাঢ় মাস এলেই পুরীর রথযাত্রাকে ঘিরে ভক্তদের আবেগ চরমে পৌঁছয়। শঙ্খধ্বনি, কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনি আর রথের রশিতে টান দেওয়ার অপেক্ষায় মুখিয়ে থাকেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু এই জগন্নাথদেবের আবির্ভাবের নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ পৌরাণিক কাহিনি, যেখানে শবর সম্প্রদায়ের আরাধ্য ‘নীলমাধব’-ই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন সমগ্র বিশ্বের পূজিত ‘জগন্নাথ’। (Nilamadhab to Jagannath)

পুরাণ অনুসারে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর একদিন দ্বারকায় একটি বৃক্ষের নীচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। সেই সময় জরা নামে এক শবর ব্যাধ দূর থেকে তাঁর রক্তিম পদযুগলকে পাখি ভেবে তীর নিক্ষেপ করেন। সেই ঘটনাতেই শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ ঘটে। পরে অর্জুন তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে গেলে অলৌকিকভাবে দেখা যায়, অগ্নিতে শ্রীকৃষ্ণের নাভিদেশ দগ্ধ হয়নি। তখন দৈববাণী হয়, এই অংশই পরমব্রহ্মের প্রতীক, একে সমুদ্রে বিসর্জন দিতে হবে। অর্জুন সেই নির্দেশ পালন করেন। অনুতপ্ত জরা সেই পবিত্র অংশের অনুসরণ করতে করতে সমুদ্রপথ ধরে পৌঁছে যান বর্তমান পুরীতে। সেখানেই স্বপ্নাদেশে শ্রীকৃষ্ণ জানান, ভবিষ্যতে তিনি শবরদের আরাধ্য ‘নীলমাধব’ রূপে পূজিত হবেন। এরপর অরণ্যের অন্তরালে গোপনে শুরু হয় নীলমাধবের আরাধনা। (Nilamadhab to Jagannath)

সময়ের প্রবাহে কলিযুগে কলিঙ্গের বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন শ্রীক্ষেত্রে এক বিশাল মন্দির নির্মাণ করেন। কিন্তু মন্দিরে প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত বিগ্রহের সন্ধান মিলছিল না। তখন রাজসভায় নীলমাধবের অলৌকিক মাহাত্ম্যের কথা জানতে পেরে তিনি চারদিকে দূত পাঠান। রাজপুরোহিত বিদ্যাপতি অনুসন্ধান করতে গিয়ে শবররাজ বিশ্ববসুর আশ্রয়ে পৌঁছন। পরে বিশ্ববসুর কন্যা ললিতার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। সেই সূত্রেই তিনি জানতে পারেন, বিশ্ববসু গোপনে নীলমাধবের পূজা করেন। (Nilamadhab to Jagannath)

বিদ্যাপতির অনুরোধে বিশ্ববসু তাঁকে চোখ বেঁধে নীলমাধবের দর্শনে নিয়ে যান। তবে বুদ্ধি খাটিয়ে বিদ্যাপতি পথজুড়ে সর্ষের দানা ছড়িয়ে রাখেন, যাতে পরে সেই পথ চিনে ফেরা যায়। নীলমাধব দর্শনের সময় দৈববাণী শোনা যায়, এবার তিনি রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের রাজকীয় উপাচারে পূজা গ্রহণ করতে চান। ইষ্টদেবতাকে হারানোর আশঙ্কায় বিশ্ববসু বিদ্যাপতিকে বন্দি করলেও, কন্যা ললিতার অনুরোধে পরে তাঁকে মুক্তি দেন। বিদ্যাপতি রাজাকে সমস্ত ঘটনা জানান। (Nilamadhab to Jagannath)

রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন শবরদের সেই গোপন পূজাস্থলে পৌঁছন, তখন সেখানে আর নীলমাধবের বিগ্রহ ছিল না। পরে স্বপ্নে শ্রীহরি রাজাকে নির্দেশ দেন, সমুদ্র থেকে ভেসে আসা পবিত্র দারু বা কাঠ দিয়েই তাঁর নতুন বিগ্রহ নির্মাণ করতে হবে। সেই বিশাল কাঠ বহু চেষ্টা করেও কেউ তুলতে পারেননি। অবশেষে জাতপাতের সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে ব্রাহ্মণ বিদ্যাপতি এবং শবররাজ বিশ্ববসু একসঙ্গে কাঠটি স্পর্শ করতেই অনায়াসে তা তীরে উঠে আসে। সেই পবিত্র দারুকাঠ থেকেই পরবর্তীকালে নির্মিত হয় জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহ। আজও সেই কাহিনি রথযাত্রার ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে এবং সাম্যের এক অনন্য বার্তা বহন করে চলেছে। (Nilamadhab to Jagannath)

আরও পড়ুন :- ২০২৬-এ ‘কৈলাস মহাকুম্ভ’, ১২ বছর পর বিরল আধ্যাত্মিক সংযোগে পুণ্যলাভের বিশেষ সুযোগ


Exit mobile version