উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের খরাপ্রবণ জেলা বান্দা এখন শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের উষ্ণতম জনবসতিগুলির মধ্যে একটির প্রতীক হয়ে উঠেছে। (Banda Heatwave) সকাল ১০টার পর প্রায় স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে জনজীবন। বাজার ফাঁকা, মাঠে কাজ বন্ধ, শ্রমিকেরা কাজ ছাড়ছেন, কৃষকরা রাতের অন্ধকারে LED ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে চাষ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়— বছরের পর বছর ধরে বন উজাড়, অতিরিক্ত খনি কার্যকলাপ, নদী থেকে লাগামছাড়া বালিখনন ও পরিবেশগত অবক্ষয় বান্দাকে ঠেলে দিয়েছে এক বিপজ্জনক তাপ-সংকটে।
উত্তরপ্রদেশের বান্দা জেলার আতারা শহরে সকাল শুরু হয় এখন ভোরেরও আগে। স্থানীয় ব্যবসায়ী লক্ষণ গুপ্তা প্রতিদিন সকাল ৬টার মধ্যেই দোকানের কাজ শুরু করেন। সরবরাহকারী ডেকে নেওয়া, হিসাব মিটিয়ে ফেলা, প্রয়োজনীয় বৈঠক— সবই শেষ করতে হয় সূর্য মাথার উপর ওঠার আগেই। সকাল ৯টার মধ্যে তিনি বাড়ি ফিরে যান।
তারপর? (Banda Heatwave) সকাল ১০টার পর প্রায় জনশূন্য হয়ে যায় রাস্তা। দোকানের শাটার খোলা থাকলেও ক্রেতা আসে না। এপ্রিল থেকে লক্ষণ গুপ্তার ব্যবসা কার্যত ভেঙে পড়েছে। তাঁর কথায়, “১০টার পর বান্দা মরুভূমির মতো হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে বাইরে আর কাউকে দেখা যায় না।”
৪৭.৬ ডিগ্রি— ভারতের সবচেয়ে উষ্ণ জেলা
চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল বান্দায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৪৭.৬° সেলসিয়াস। (Banda Heatwave) সেদিন শুধু ভারতের নয়— বিশ্বের ৮,২১২টি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে উষ্ণতম শহর বলে জানিয়েছে লখনউ আবহাওয়া দফতর। এটাই ১৯৫১ সালের পর বান্দার সর্বোচ্চ এপ্রিল তাপমাত্রা।
এর আগের রেকর্ড ছিল—
৩০ এপ্রিল ২০২২-এ ৪৭.৪°সেলসিয়াস, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ৪৭.৪° সেলসিয়াস। এরপর আবার ১৮ মে ২০২৬-এ বান্দা পৌঁছে যায় ৪৭.৬°সেলসিয়াসে। ১৭ মে-তেও তাপমাত্রা ছিল ৪৬.৪°সেলসিয়াস। ১৬ এপ্রিল থেকেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে শুরু করে, যখন পারদ ওঠে ৪৪.৪°সেলসিয়াসে।
আরও শক্তি বাড়ছে ভারতের? ইন্দো-প্যাসিফিক সম্পর্ক নিয়ে বড় বার্তা দিলেন এস জয়শঙ্করের
দিনের বদলে রাতে চাষ, LED আলোয় মাঠে কৃষক
(Banda Heatwave) এই তীব্র গরমে বান্দার বহু কৃষক দিনের কাজ সরিয়ে নিয়েছেন রাতের দিকে। রাতে LED ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে চাষ হচ্ছে। দিনের বেলা মাঠে কাজ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, নির্মাণ শ্রমিকদেরও দুপুরের শিফট প্রায় বন্ধ। ঠিকাদারদের দাবি, অনেক শ্রমিক ১০টা সকাল থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে কাজ না করে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত আয় স্বেচ্ছায় কম নিচ্ছেন। এছাড়াও দোকান, ছোট ব্যবসা, বাজার থেকে শুরু করে সবই এখন সূর্যাস্তের পরে খুলছে। স্থানীয়দের মতে, এই বছর কাজের খোঁজে অন্যত্র যাওয়া বা শ্রমিকদের স্থানান্তরও স্বাভাবিকের চেয়ে আগেই শুরু হয়েছে।
ঘরে কুলার, তবু স্বস্তি নেই
ভাদেদু গ্রামের প্রহ্লাদ বাল্মীকি একটি ১৭ ফুট × ১৭ ফুট ঘরে বসে থাকেন। ঘরের একদিকে বড় কুলার চললেও গরম কমে না। তাঁর স্ত্রী গ্রামের প্রধান। সারা গ্রীষ্মজুড়ে গ্রামের মানুষ তাদের কাছে আসছেন—পানীয় জলের সমস্যা, গরমজনিত অসুস্থতা, ফসলের ক্ষতি ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে। প্রহ্লাদের কথায়, “এভাবে চলতে থাকলে বান্দা আর বসবাসযোগ্য থাকবে না।”
(Banda Heatwave) অন্যদিকে ট্রান্সফরমার ঠান্ডা রাখতে জল ঢালছে বিদ্যুৎ কর্মীরা। তাপমাত্রা শুধু মানুষের জীবন নয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করেছে। বান্দার ৪৪টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে কর্মীরা প্রায় ১,৩৭৯টি ট্রান্সফরমারের উপর নিয়মিত জল ঢালছেন। গত ৪৫ দিনে অতিরিক্ত তাপ ও বিদ্যুৎ চাহিদায় বহু ট্রান্সফরমার বিকল হয়েছে। জেলায় প্রায় ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
শুধু গরম নয়, এর পেছনে আছে পরিবেশ ধ্বংসের দীর্ঘ ইতিহাস
গবেষক ও পরিবেশকর্মীদের মতে, এটি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক তাপপ্রবাহ নয়। এটি বহু বছরের পরিবেশগত ক্ষয়ের ফল। বনভূমি হারিয়েছে বান্দা। বান্দা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক অর্জুন পি ভার্মার গবেষণায় দেখা গেছে—১৯৯১–৯২ সাল থেকে ২০২১–২২ সাল পর্যন্ত জেলার বনভূমি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। শুধু তাই নয়, খোলা বনভূমিও একইভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের নতুন গবেষণা বলছে, ২০০৫ সালে মোট বনভূমি ছিল প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৯৫ বর্গকিলোমিটারে অর্থাৎ কমেছে ১৫.৫৪%। ঘন বনভূমি কমেছে প্রায় ১৭.৫৫%। গবেষকদের সতর্কবার্তা— বর্তমান ধারা চলতে থাকলে আগামী দুই দশকে জেলার কিছু অংশ অনুর্বর হয়ে যেতে পারে।
দিল্লিতে তাপপ্রবাহের দাপট, জারি হল হলুদ সতর্কতা
খনি, পাহাড় ধ্বংস আর মাটির জলধারণ ক্ষমতা নষ্ট
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি কমার প্রধান কারণ—
- বৃহৎ পরিসরের খনি কার্যকলাপ
- কৃষিজমির সম্প্রসারণ
- পাহাড় কেটে পাথর তোলা
বুন্দেলখণ্ডের বিন্ধ পর্বতমালার বহু অংশে বিস্ফোরণ চালিয়ে খনন চলছে। স্থানীয় কৃষক ও কর্মী বান্দা গোপাল জানান, প্রায় ২৫% বিন্ধ পাহাড় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, বিন্ধ অঞ্চলের বেলেপাথর বর্ষার জল শোষণ করে ভূগর্ভস্থ জল ভরাট করত। অতিরিক্ত বিস্ফোরণে সেই স্বাভাবিক ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে।
নদীও আর আগের মতো নেই
বান্দা দিয়ে প্রবাহিত চারটি প্রধান নদী—
- কেন
- যমুনা
- রঞ্জ
- বাগাই
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, কেন নদীতে বালিখননের মাত্রা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক রামলাল জায়ানের মতে, প্রতিদিন প্রায় ৫৫ হাজার টন লাল বালি উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। বড় মেশিন দিয়ে নদীর ভেতর থেকেই বালি তোলা হচ্ছে। যদিও ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT)-এর নিয়ম অনুযায়ী সক্রিয় নদীখাতে ভারী যন্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ।
জল সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রাপ্ত উমাশঙ্কর পাণ্ডের মতে, নদীর প্রাকৃতিক বালির স্তর নষ্ট হওয়ায় জল ধরে রাখার ক্ষমতা কমেছে এবং ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে এক্সপ্রেসওয়ের জন্য কাটা হয়েছে প্রায় ১.৯ লক্ষ গাছ। তথ্য অধিকার আইনের জবাবে ২০২০ সালে উত্তরপ্রদেশ বনদফতর জানিয়েছিল, বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে প্রায় ১,৮৯,০৩৬টি গাছ কাটা হয়েছে। তার মধ্যে বান্দা জেলার অংশও রয়েছে।
এবার থেকে জিরো FIR, অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা, কড়া বার্তা অগ্নিমিত্রার
কেন এত ভয়াবহ গরম?
বিশেষজ্ঞদের মতে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে-
- বনভূমি কমে যাওয়া
- মাটির আর্দ্রতা হ্রাস
- নদী শুকিয়ে যাওয়া
- অতিরিক্ত বালির স্তর
- জলাধার কমে যাওয়া
- থর মরুভূমি থেকে আসা গরম পশ্চিমা হাওয়া
- পাথুরে ভূখণ্ডে দ্রুত তাপ সঞ্চয়
লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ধ্রুব সেন সিংয়ের মতে, বান্দা কার্যত একটি “হিট আইল্যান্ড”-এ পরিণত হয়েছে। দিনের তাপ রাতেও পুরোপুরি বেরিয়ে যেতে পারে না। ফলে নতুন দিনের সূচনা হয় আগের দিনের জমে থাকা উত্তাপ নিয়েই।
সন্ধ্যা নামলে ফের ফিরে আসে জীবন
দিনের বেলা ফাঁকা থাকা আতারা বাজার সন্ধ্যা নামার পর আবার খুলে যায়। চায়ের দোকানে ভিড় বাড়ে। মোটরসাইকেল দেখা যায় রাস্তায়। লক্ষণ গুপ্তা আবার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের অপেক্ষা করেন। (Banda Heatwave) কিন্তু বাস্তবতা বদলায় না—প্রতিদিন প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা বান্দার বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে যাচ্ছে। আর সেই সময়েও জেলার রাস্তা দিয়ে চলতেই থাকে খনির ট্রাক।
বান্দার গল্প এখন শুধু একটি জেলার গল্প নয়, এটি সরাসরি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন আর স্থানীয় পরিবেশ ধ্বংস, মানুষের দৈনন্দিন জীবন কত দ্রুত বদলে দিতে পারে।
৪২ জন বর, নেই কনে! গণবিয়ের নামে কোটি টাকার প্রতারণা মধ্যপ্রদেশের

