নাড়ির টান বুঝি একেই বলে। জন্ম নাগপুরে, তারপর জীবনের পথ তাঁকে নিয়ে গিয়েছে ইউরোপে। কিন্তু জন্মদাত্রী মায়ের স্মৃতি কখনও মুছে যায়নি। অবশেষে সেই টানেই ৪১ বছর পর আবার ভারতে ফিরে এলেন নেদারল্যান্ডসের মেয়র ফাল্গুন বিন্নেনডাইক (Falgun Binnendijk)। নিজের মায়ের খোঁজে, নিজের অস্তিত্বের খোঁজে।
১৯৮৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মহারাষ্ট্রে নাগপুরে জন্ম হয় ফাল্গুনের। কিন্তু ফাল্গুনের মা ছিলেন অবিবাহিত। এই সন্তানকে রাখতে চাননি তিনি। জন্মের মাত্র তিন দিনের মাথায় তাই ফাল্গুনকে একটি আশ্রয় কেন্দ্রে (মাতরু সেবা সংঘ) রেখে চলে যান। এরপর প্রায় এক মাস পর মুম্বই থেকে এক ডাচ দম্পতি শিশুটিকে দত্তক নেন এবং তাকে নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যান। সেখানেই বড় হয়ে ওঠেন তিনি।নেদারল্যান্ডসে বড় হলেও নিজের জন্মভূমি ভারত এবং জন্মদাত্রী মায়ের পরিচয় জানার আগ্রহ কখনও মুছে যায়নি। বড় হয়ে সমাজসেবায় যুক্ত হন তিনি, ধীরে ধীরে রাজনীতিতে পা রাখেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে নেদারল্যান্ডসের হিমস্টেড শহরের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।
তবে প্রশাসনিক দায়িত্বের মাঝেও তাঁর মনে ছিল এক অপূর্ণতা, জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে একবার দেখা করার আকাঙ্ক্ষা। তিনি জানান, মহাভারতের কর্ণ যেমন তাঁর মা কুন্তীর সঙ্গে দেখা করার অধিকার রাখে, তেমনই প্রতিটি সন্তানের নিজের মায়ের সঙ্গে দেখা করার অধিকার আছে।
প্রথমবার ২০০৬ সালে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ভারতে এসেছিলেন নিজের শিকড় খুঁজতে। এরপর ২০১৭, ২০২৪ এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে আবার ভারতে আসেন সেই খোঁজ চালিয়ে যেতে। নাগপুরের হাসপাতাল, আশ্রয় কেন্দ্র এবং প্রশাসনিক নথিপত্র ঘেঁটে নিজের জন্মসংক্রান্ত তথ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন তিনি।এই অনুসন্ধানের সময় তিনি এক নার্সের খোঁজ পান, যিনি নবজাতক অবস্থায় তাঁর যত্ন নিয়েছিলেন। সেই নার্স জানান, শিশুটির নাম তখন রাখা হয়েছিল ‘ফাল্গুন’। এত বছর পর সেই নার্সের সঙ্গে দেখা করে আবেগে ভেঙে পড়েন মেয়র, নিজের অস্তিত্বের এক সাক্ষীকে খুঁজে পান তিনি।
যদিও এখনও তাঁর জন্মদাত্রী মায়ের সন্ধান মেলেনি, তবুও আশাহত নন তিনি। তাঁর ডাচ স্ত্রী ও তাঁকে এই বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর একটাই ইচ্ছে- একবার যদি মায়ের সঙ্গে দেখা হয়, তবে শুধু এটুকুই বলতে চান, ‘ভালো আছি, সুখে আছি’। এখানেই ঘটনাটি আর পাঁচটি ঘটনা থেকে আলাদা। যেই নবজাতককে তার মা ছেড়ে গিয়েছিলেন মাত্র তিনদিন বয়সে আজকে দাঁড়িয়ে সেই মায়ের প্রতি তাঁর কোনও অনুযোগ নেই, ঘৃণা নেই শুধু আছে শিকড়কে জানার এক অমোঘ আকর্ষণ। আসলে মায়েরা কেবল মা ই হন, হোক না সে মা অবিবাহিতা, তাতে তো সন্তানের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভাঙন হতে পারে না।
জন্মের পর পরই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক জীবনের গল্প আজ গোটা মানবজাতির আবেগকে নাড়া দিচ্ছে। আগামী দিনেও ফাল্গুন তাঁর জন্মদাত্রী মায়ের খোঁজ চালিয়ে যাবেন বলেই জানিয়েছেন। কে বলতে পারে বিধাতা হয়তো একদিন ফাল্গুনকে মিলিয়ে দেবেন তাঁর ‘কুন্তী’র সঙ্গে।

