হঠাৎ করে হোটেল, পিজি (পেইং গেস্ট) বন্ধের হিড়িক পড়েছে বেঙ্গালুরুতে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ কাজের সূত্রে, পড়াশোনার জন্য বেঙ্গালুরুতে থাকেন। তাদের অধিকাংশেরই একমাত্র ভরসা পিজি বা হোটেল। কিন্তু হঠাৎ এই পরিষেবা বন্ধে মাথায় হাত ওইসব ভিন রাজ্যের মানুষগুলির। কিন্তু কেন এই অবস্থা?ব্যাপার কি ?
বেঙ্গালুরুর বিভিন্ন হোটেলের বা পিজি মালিকদের সূত্রে খবর, শহরে বর্তমানে এই সব অস্থায়ী আবাসন নিয়ে বড়সড় সংকট দেখা দিয়েছে। শুধু মাত্র বেঙ্গালুরু নয় এই একই ছবি চেন্নাই, মুম্বাই এর মত শহরেও দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে শহরের গুরুত্বপূর্ণ আইটি হাব এলাকাগুলিতে প্রায় প্রতিদিনই অন্তত দু’টি করে পিজি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বেঙ্গালুরুর মারাঠাহল্লি ও মহাদেবপুরা এলাকার মতো প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলিতে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে এই ঘটনার পিছনে মূল কারণ জ্বালানি সংকট বলেই ধারণা একাংশের।LPG Cylinder Crisis
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে চলতি মাসে প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। কাতার এনার্জির কিছু স্থাপনায় হামলার ঘটনার জেরে এলএনজি সরবরাহ সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে রান্নার গ্যাসে।
সোমবার Bangalore Hotels Association এর তরফে জানানো হয়েছে, “১০ মার্চ থেকে শহর জুড়ে হোটেল ও রেস্তোরাঁর স্বাভাবিক কাজকর্মে বড় প্রভাব পড়তে পারে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।তাদের দাবি, গ্যাস না পাওয়ায় আগামীকাল থেকেই অনেক হোটেল বন্ধ রাখতে হতে পারে।” তারা আরও জানিয়েছেন, “হোটেল শিল্প একটি অত্যাবশ্যক পরিষেবা। অনেক সাধারণ মানুষ, ছাত্রছাত্রী এবং চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষ প্রতিদিনের খাবারের জন্য হোটেলের উপর নির্ভর করেন। ফলে হোটেল বন্ধ হলে তাঁদেরও সমস্যায় পড়তে হবে।” সংগঠনের মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হোটেল শিল্পকেও নানা সমস্যার মুখে পড়তে হবে।
তাদের অভিযোগ, তেল কোম্পানিগুলি আগে ৭০ দিন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছিল।তাই হঠাৎ করে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে হোটেল শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। একইভাবে চেন্নাই হোটেল অ্যাসোসিয়েশন এর প্রেসিডেন্ট এম রবি ও প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে সেখানকার অবস্থার কথা জানিয়েছেন। LPG Cylinder Crisis
যদিও ভারত সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, দেশে আপাতত যে জ্বালানি মজুত রয়েছে তাতে আগামী কিছুদিন এলপিজি গ্যাসের জোগান দেওয়া যাবে। তবুও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এলপিজি গ্যাস ব্যবহার নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ২৫ দিনের ব্যবধানে গ্যাস বুকিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সরবরাহে চাপ না পড়ে। এদিকে যুদ্ধ আবহে রান্নার গ্যাসের দামও ৬০ টাকা বেড়ে গেছে। বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বেড়েছে ১১৫ টাকা। ফলে মধ্যবিত্তের পকেটে টান পড়ছে।
এই জ্বালানি সংকটে বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়েছে খাবার এবং থাকার হোটেলগুলি। বড়ো রেস্টুরেন্ট বা হোটেলে ইন্ডাকশন বা ইলেকট্রিক ওভেনে রান্না করা সম্ভব নয়। কাজেই জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং সীমিত জোগানের কারণেই কার্যত ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অনেকেই। জানা যাচ্ছে, বেঙ্গালুরুর বহু পিজি মালিক বর্তমানে আর্থিক চাপে পড়েছেন। জ্বালানির বাড়তি খরচ, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক মালিকই ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ফলে বাধ্য হয়েই অনেকেই হোটেল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে ছাঁটাইয়ের ঘটনাও বেড়েছে। এর ফলে শহরে কর্মরত অনেক তরুণ কর্মী অন্যত্র চলে যাওয়ায় পিজিতে থাকার চাহিদাও কিছুটা কমে গেছে।
এই পরিস্থিতির আরেকটি বড় কারণ হল, প্রশাসনের কড়া নজরদারি। গ্রেটার বেঙ্গালুরু অথরিটি (GBA) নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে একাধিক পিজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক পিজিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছিল না। সূত্রের খবর, বেঙ্গালুরু শহরেই প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি পিজি এখন আইনি জটিলতার মুখে পড়তে পারে। এর মধ্যে জ্বালানির সংকট যেন আগুনে নতুন করে ঘি ঢালার কাজ করছে।LPG Cylinder Crisis
তবে দেশজুড়ে জ্বালানি এবং রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আবহে এখনও তেমন কোনও প্রভাব সেই অর্থে পশ্চিমবঙ্গে পড়েনি। বাংলায় বিভিন্ন প্রান্তে রান্নার গ্যাসের জোগানও আপাতত স্বাভাবিক আছে বলেই খবর। তবে দেশজুড়ে সংকটের ছবি দেখা যাচ্ছে তাতে বাংলার পরিস্থিতিও যে কতদিন স্বাভাবিক থাকবে তা নিয়ে সিঁদুরের মেঘ দেখছেন অনেকেই। এখন দেখার কবে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং দেশজুড়ে মানুষের হয়রানির ছবিটিও পাল্টায়।

