ইরান যুদ্ধের জেরে পশ্চিম এশিয়ায় বাড়তে থাকা অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালী ঘিরে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেন সংকটের মধ্যেই পাঁচ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সফরে বেরিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (PM Modi Five Nation Tour)। ১৫ মে থেকে শুরু হওয়া এই উচ্চপর্যায়ের সফরে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE), নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে এবং ইতালি সফর করবেন। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য নয় বরং ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করার বড় পদক্ষেপ।
ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরের পর এই সফর (PM Modi Five Nation Tour) বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি এই চুক্তিকে “মাদার অফ অল ডিলস” বলেও উল্লেখ করেছিলেন। ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এআই, সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন এনার্জি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলার নতুন বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
কেন এই সফর (PM Modi Five Nation Tour) ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহণ হয়। এই রুটে চাপ বাড়লে ভারতের মতো জ্বালানি আমদানি নির্ভর দেশের উপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। তাই UAE-র সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি, স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ এবং বিকল্প শক্তি সহযোগিতা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলি এখন চিনের বিকল্প উৎপাদন ও প্রযুক্তি অংশীদার খুঁজছে। ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে। এই সফরে সেমিকন্ডাক্টর, এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, গ্রিন হাইড্রোজেন, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, বৈদ্যুতিক যান এবং সামুদ্রিক প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ ও চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফর ভারতের “মেক ইন ইন্ডিয়া” এবং “ডিজিটাল ইন্ডিয়া” উদ্যোগে নতুন গতি আনতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহী
সফরের (PM Modi Five Nation Tour) প্রথম ধাপে প্রধানমন্ত্রী মোদি আবু ধাবিতে UAE প্রেসিডেন্ট মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ২০১৪ সালের পর এটি মোদির অষ্টম UAE সফর, যা দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতাকেই তুলে ধরে। বর্তমানে UAE ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য জ্বালানি অংশীদার। দীর্ঘমেয়াদি তেল ও গ্যাস সরবরাহ চুক্তির মাধ্যমে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকটাই শক্তিশালী হয়েছে। এই সফরে LPG এবং Strategic Petroleum Reserve নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারত-UAE দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রথমবার ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০৩২ সালের মধ্যে এই বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছনোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ভারত ও UAE-র মধ্যে Local Currency Settlement (LCS) ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এখন ভারতীয় টাকা ও দিরহামে সরাসরি বাণিজ্য সম্ভব হচ্ছে, ফলে ডলারের উপর নির্ভরতা কমছে।
নেদারল্যান্ডস
নেদারল্যান্ডস সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদি ডাচ নেতৃত্বের সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর, জল ব্যবস্থাপনা, গ্রিন হাইড্রোজেন এবং সামুদ্রিক প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করবেন। বর্তমানে নেদারল্যান্ডস ভারতের ইউরোপে বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্যগুলির মধ্যে অন্যতম। এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল টাটা ইলেকট্রনিক্স এবং ASML-এর সম্ভাব্য চুক্তি। গুজরাটের ঢোলেরায় তৈরি হতে চলা সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্টে প্রযুক্তি সরবরাহ করবে ASML। এটি ভারতের চিপ উৎপাদন শিল্পে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি ও নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে আফসলুইটডিজক বাঁধ পরিদর্শন করবেন। জল নিয়ন্ত্রণ, টেকসই মৎস্যচাষ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সুইডেন
আট বছর পর সুইডেন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন এবং ইউরোপীয় শিল্প গোষ্ঠীর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ভারত-সুইডেন প্রযুক্তি এবং এআই করিডর (SITAC) এই সফরের অন্যতম বড় আকর্ষণ। 6G, এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, লাইফ সায়েন্স এবং ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পে যৌথ কাজের পরিকল্পনা হয়েছে। সুইডেনের ৮০টিরও বেশি কোম্পানি এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬-এ অংশ নিয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। হরিয়ানার ঝাজ্জারে কার্ল-গুস্তাফ অস্ত্রের উৎপাদন ইউনিট তৈরি করছে, যা সুইডেনের বাইরে তাদের প্রথম কারখানা। ইভি ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্সে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহেও দুই দেশের অংশীদারিত্ব বাড়ছে।
নরওয়ে
৪৩ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর পৃথক নরওয়ে সফর হতে চলেছে। অসলোতে প্রধানমন্ত্রী মোদি তৃতীয় ভারত-নর্ডিক সামিট-এ অংশ নেবেন। ভারত-ইএফটিএ টিইপিএ কার্যকর হওয়ার পর আগামী ১৫ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ও ১০ লক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নরওয়ের বিশাল সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ইতিমধ্যেই ভারতীয় বাজারে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারতীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পও বড় সুবিধা পাচ্ছে। কোচিন শিপইয়ার্ড নরওয়ের জন্য পরিবেশবান্ধব জাহাজ তৈরি করছে। এছাড়া জিআরএসই এবং কংসবার্গ মেরিটাইম-এর যৌথ উদ্যোগে ভারতের প্রথম পোলার গবেষণা ভেসেল তৈরি হবে। মহাকাশ গবেষণাতেও দুই দেশের সম্পর্ক গভীর হয়েছে। নরওয়ের সোয়ালবার্ড-এ ইসরো-র অ্যান্টেনা চালু হয়েছে এবং হিমাদ্রি গবেষণা কেন্দ্র ইতিমধ্যেই ৪০০-র বেশি বিজ্ঞানীকে সহায়তা করেছে।
ইতালি
সফরের শেষ ধাপে প্রধানমন্ত্রী মোদি ইতালিতে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং প্রেসিডেন্ট সার্জিও ম্যাটারেলা-এর সঙ্গে বৈঠক করবেন।ভারত-ইতালি বাণিজ্য বর্তমানে ১৬.৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা ২০ বিলিয়ন ইউরোতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। টাটা মোটরসের ৩.৮ বিলিয়ন ইউরোতে আইভিকো গ্রুপ অধিগ্রহণ ইতালিতে ভারতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইএমইইসি করিডর এবং স্পার্কল-এয়ারটেল ব্ল্যু রামান সাবমেরিন কেবল চালু হওয়ার ফলে ভারত-ইউরোপ সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে। পরিষ্কার জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত বিনিয়োগেও দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পাঁচ দেশের সফর (PM Modi Five Nation Tour) শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করবে না, বরং আগামী দশকে ভারতকে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পথও আরও প্রশস্ত করবে।
ভারতের সামরিক শক্তিতে বড় পদক্ষেপ, শিরডিতে উদ্বোধন ডিফেন্স কারখানার: PM Modi Five Nation Tour: পাঁচ দেশের মেগা কূটনৈতিক সফর নরেন্দ্র মোদির, আলোচনায় কোন কোন বিষয়?
