Site icon Hindustan News Point

Summer Health Care Guide: গরম মানেই শুধু ঘাম নয়: মন, পেট আর শরীরের গোপন বিপদ

Man sweating in busy street Summer Health Care Guide

ব্রততী সিনহা রায়

বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে শুধু অস্বস্তি নয়, শরীরের ভেতরে শুরু হয় চাপের লড়াই (Summer Health Care Guide)। খিটখিটে মেজাজ, পেটের গোলমাল, অনিদ্রা, দুর্বলতা-সবকিছুর পেছনেই আছে বিজ্ঞান। তাই এই গরমে দরকার শুধু জল নয়, দরকার শরীর-মন-পেট-তিন দিকেই সচেতন যত্ন।

বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠের গরমকে আমরা অনেক সময় খুব সাধারণ করে দেখি- “এই তো, একটু ঘাম হচ্ছে”, “গরমে এমন তো হয়েই থাকে।” কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অতিরিক্ত গরম মোটেও সাধারণ কিছু নয়। বরং এটি শরীরের জন্য এক ধরনের স্ট্রেস টেস্ট। বাইরে তাপমাত্রা বাড়লে শরীর নিজের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। যখন বাইরের তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক সীমা ৩৭°C-কে ছাড়িয়ে যেতে চায়, তখন শরীর নিজেকে বাঁচাতে চালু করে একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা-থার্মোরেগুলেশন। কিন্তু এই লড়াইয়ে শরীর একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে-আর তখনই শুরু হয় শরীর, ত্বক, মন-এমনকি পেটেরও সম্মিলিত ‘বিদ্রোহ’। (Summer Health Care Guide)

শরীরের ভেতরে গরমের অদৃশ্য যুদ্ধ

আমাদের শরীরের ‘থার্মোস্ট্যাট’ হলো মস্তিষ্কের একটি অংশ-হাইপোথ্যালামাস। গরম বাড়লে এটি শরীরকে ঠাণ্ডা রাখতে একাধিক প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা চালু করে। তাই ঘাম হয়, যাতে শরীরের তাপ বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে যায় জল, লবণ, সোডিয়াম, পটাশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় উপাদানও। এর ফল-দুর্বলতা, পেশিতে টান, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, বমিভাব, এমনকি অস্বাভাবিক অবসন্নতাও। শরীর ঠান্ডা রাখতে রক্তনালী প্রসারিত হয় এবং ত্বকের দিকে রক্তপ্রবাহ বাড়ে। এতে রক্তচাপ কিছুটা নেমে যেতে পারে, হৃদযন্ত্রকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তাই অনেকেই গরমে বুক ধড়ফড়, ঝিমুনি, হাসফাঁস বা হালকা শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই তাপজনিত চাপ হার্ট, কিডনি, ডায়াবেটিস, শ্বাসতন্ত্র ও মানসিক স্বাস্থ্যের আগের সমস্যাকে আরও খারাপ করে দিতে পারে।

মন খিটখিটে হয় কেন, সহ্যশক্তি কমে যায় কেন গরমে

“মেজাজটা ভালো নেই” – এই কথাটি নিছক অনুভূতি নয়, এর পেছনে আছে বিজ্ঞান। অতিরিক্ত তাপ মানুষের বিরক্তি, মানসিক ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, রিঅ্যাকশন টাইম কমে যাওয়া, এমনকি বিষণ্ণতার উপসর্গ বাড়ার সঙ্গে যুক্ত। প্রচন্ড গরমে ঘুম নষ্ট হয়, শরীর আরাম পায় না, ফলে মস্তিষ্কও চাপের মধ্যে কাজ করে। সেই কারণেই ছোটখাটো বিষয়েও রাগ, অস্থিরতা, অকারণ অস্বস্তি বা “সবকিছুতেই বিরক্ত লাগছে” – এমন অনুভূতি খুব স্বাভাবিক। রাতে সমস্যা আরও বাড়ে। কারণ শরীর ঘুমের আগে স্বাভাবিকভাবেই একটু ঠান্ডা হতে চায়। কিন্তু গরমে সেই তাপমাত্রা না নামলে গভীর ঘুম আসে না। ফলাফল-সকালে মাথা ভার, কাজে মন না বসা, ধৈর্য কমে যাওয়া, সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা, এমনকি সম্পর্কেও টানাপোড়েন। তাই গরমের সময় মানসিক অস্থিরতা অনেক সময় “মন খারাপ” নয়, বরং “শরীরের অতিরিক্ত চাপের ভাষা”।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

গরম সবার জন্যই কষ্টকর, কিন্তু কিছু মানুষ তুলনামূলক বেশি বিপদে থাকেন। যেমন-শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, বাইরে কাজ করা মানুষ, ক্রীড়াবিদ, একা থাকা ব্যক্তি, টপ-ফ্লোর ফ্ল্যাটে থাকা মানুষ, এবং যাদের হার্ট, ফুসফুস, কিডনি, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, পারকিনসনস বা কিছু মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা আছে। কারণ, অনেক সময় তাঁদের শরীর তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারে না; আবার কারও তৃষ্ণাবোধ কম থাকে, কারও ওষুধ ডিহাইড্রেশন বা ওভার হিটিংয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। (Summer Health Care Guide)

নারী ও হরমোন: যাদের পিসিওএস (PCOS) বা থাইরয়েডের সমস্যা আছে, তাদের শরীরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক হরমোনগুলো গরমে আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে শরীরের “গরম টের পাওয়া”-র ক্ষমতা কমে যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো ওরা নিজেরা বুঝে জল চাইতে পারে না, আবার দ্রুত ডিহাইড্রেটও হয়। গর্ভাবস্থায় শরীরের ভেতরে জলচাহিদা ও তাপ-চাপ দুটোই বেশি থাকে। আর যারা বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, ডিমেনশিয়া বা অন্যান্য মানসিক সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের ক্ষেত্রে তীব্র গরম পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হতে পারে।

গরমে বেশি করে জল খান (ছবি: AI)

গরমে পেটের গোলমাল বাড়ে কেন

অনেকেই বলেন, “গরম পড়লেই আমার অম্বল হয়”, “কিছু খেলেই পেট খারাপ”, “বমি বমি লাগে”-এগুলো কাকতালীয় নয়। তীব্র গরমে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে ত্বকের দিকে বেশি রক্ত পাঠায়। ফলে পাকস্থলী ও অন্ত্রে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে হজমের গতি মন্থর হতে পারে, অস্বস্তি বাড়তে পারে। তীব্র তাপ ও ডিহাইড্রেশন মিলে বমিভাব, পেট মোচড়, ডায়রিয়া বা হজমের জটিলতা তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে গরমকালের আরেক বড় ঝুঁকি হলো খাদ্যবাহিত সংক্রমণ। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় জীবাণু খুব দ্রুত বাড়ে। বাইরে রাখা রান্না, কাটা ফল, দীর্ঘক্ষণ ঠাণ্ডার বাইরে থাকা দুধ-দই-মাংসজাত খাবার-এসব সহজেই পেটের সমস্যা ডেকে আনতে পারে। ডায়রিয়া, বমি, পেটব্যথা, জ্বর-এসবই Food Poisoning বা খাদ্যে বিষক্রিয়ার সাধারণ লক্ষণ।

ত্বক: শরীরের ‘স্ট্রেস স্ক্রিন’

প্রচণ্ড গরমে ত্বকই অনেক সময় শরীরের চাপের প্রথম দৃশ্যমান সংকেত দেয়। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, অতিরিক্ত ঘাম, ধুলোবালি, তেল আর জল শূন্যতা-সব মিলিয়ে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাস্তর দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে রোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ বাড়তে পারে, ঘাম জমে হিট র‌্যাশ বা ঘামাচির প্রবণতা বাড়ে, আর আর্দ্র পরিবেশে ফাঙ্গাল সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। শরীরে জলের ঘাটতি হলে ত্বক হয়ে ওঠে শুষ্ক, টানটান, রুক্ষ ও নিষ্প্রভ। আর মুখে ব্রণ, র‍্যাশ, রোদে পোড়া দাগ বা ঘামাচির মতো দৃশ্যমান পরিবর্তন অনেকের মধ্যেই অস্বস্তি, আত্মসচেতনতা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি করে। অর্থাৎ, গরমে ত্বকের সমস্যা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এর প্রভাব গিয়ে পড়ে মানসিক স্বস্তি এবং সামাজিক আত্মবিশ্বাসের ওপরও। তাই ত্বকের যত্ন মানে শুধু “ভালো দেখা” নয়, “ভালো থাকা”ও। (Summer Health Care Guide)

ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাস্তর দুর্বল হয়ে পড়ে (ছবি: AI)

শুধু ক্লান্তি নয়, কখন সতর্ক হবেন Heat Exhaustion vs Heatstroke

যদি প্রচুর ঘাম, দুর্বলতা, মাথা ঝিমঝিম, পেশিতে টান, বমিভাব, মাথাব্যথা, বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দেয়, তা heat exhaustion-এর লক্ষণ হতে পারে। এ অবস্থায় ঠান্ডা জায়গায় বিশ্রাম, জল বা ORS, ভেজা কাপড়, এবং দ্রুত শরীর ঠান্ডা করা জরুরি। কিন্তু যদি শরীর খুব গরম হয়ে যায়, বিভ্রান্তি, প্রলাপ, অচেতনতা, ঘাম কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দ্রুত শ্বাস, বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়, তখন সেটি heatstroke-এর বিপজ্জনক সংকেত হতে পারে। দেরি না করে চিকিৎসা নিতে হবে।

Summer Health Care Guide: গরমে সুস্থ থাকার কিছু বৈজ্ঞানিক ও ঘরোয়া সমাধান ও টিপস

গরম মানে শুধু পারদ চড়া নয়, এটি আমাদের শরীরের একটি ‘স্ট্রেস টেস্ট’। প্রকৃতির তীব্রতা আমাদের হাতে নেই, কিন্তু সঠিক সচেতনতা আমাদের হাতে। নিজের শরীর, মন এবং পেটের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। নিজেকে হাইড্রেটেড রাখুন এবং এই কঠিন সময়ে নিজের ও চারপাশের মানুষের প্রতি সংবেদনশীল থাকুন।

আপনার সুস্থতা ও সচেতনতাই আমাদের কাম্য। প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যকে সচেতন হতে সাহায্য করুন।


লেখক পরিচিতি

ব্রততী সিনহা রায় একজন পেশাদার কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট এবং সাইকোথেরাপিস্ট। তবে তাঁর কাজের ধরনকে আলাদা করে তোলে তাঁর গভীর মানবিকতা ও হিউম্যানিস্টিক অ্যাপ্রোচ। তিনি শুধুমাত্র সমস্যার সাময়িক সমাধানে বিশ্বাসী নন; বরং মানুষের ভেতর থেকে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার পথ তৈরি করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

তিনি একটি হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ অনুসরণ করেন, যেখানে বিভিন্ন ধরনের থেরাপির পাশাপাশি মানুষের মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে স্পিরিচুয়াল দিককেও গুরুত্ব দেন। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।

নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তিনি মানুষের মানসিক কষ্টকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছে মানুষের পাশে থাকার, তাদের ভালো রাখার এবং তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এক আন্তরিক ইচ্ছা।

এই বিশ্বাস এবং শিক্ষা থেকেই তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত আরও সমৃদ্ধ করে তুলছেন—শুধু একজন পেশাদার হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও—যাতে তিনি অন্যদের জীবনে সত্যিকারের সুস্থতা ও শান্তি নিয়ে আসতে পারেন।



Exit mobile version