---Advertisement---

Ashes Test: এখনও ইংল্যান্ড ক্রিকেটে কি “বাজবল” চলবে?

January 16, 2026 3:40 PM
Ashes Test
---Advertisement---

কুশল চক্রবর্তী

অবশেষে শেষ হল বিশ্ব ক্রিকেটে চিরকালীন শুম্ভ আর নিশুম্ভের লড়াই বলে অভিহিত অ্যাশেজ সিরিজ (Ashes Test)। টেস্ট ক্রিকেটের এই যে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার লড়াই বলতে গেলে তা প্রায় ১৪৮ বছর অতিক্রম করেছে। বিগত বছরগুলোর মত এবারও ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে ধরে রেখেছে তাদের অ্যাশেজ সিরিজের আধিপত্য। মাঠে লোক হয়েছে প্রচুর। খেলায় যে উত্তজনা ছিল না তা নয়। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত “বার্মি আর্মি” অস্ট্রেলিয়ার মাঠে ইংল্যান্ডের জন্য গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে গেছে। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটের যে নান্দনিক সৌন্দর্য তা কি দেখা গেছে? টেস্ট ক্রিকেটে যে ড্র বলে একটা বস্তু আছে, আর তা মাঠে দাঁড়িয়ে করার মধ্যেও যে অনেক ক্রিকেটীয় গুন দরকার, তা বোধহয় বাণিজ্যিক সাফল্যের আশায় ক্রিকেট থেকে মুঝে যাচ্ছে।

ক্রিকেটকে পণ্য করতে গিয়ে, টেস্ট ক্রিকেটের একটা সুন্দর রূপই আজ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এবারের সদ্য সমাপ্ত ৪৮টি টেস্টে মাত্র ৬টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। অর্থাৎ কিনা বাজারের চাহিদা ঠিক করে দেবে খেলাটার ফলাফল কোনদিকে যাবে।

Ashes Test
ট্রফি জিতে সমর্থকদের সঙ্গে স্মিথ

এই সিরিজের প্রথম টেস্টে, পারথের মাঠে দু’দিনের খেলাতেই ইংল্যান্ড হেরেছিল আট উইকেটে। চারটে ইনিংস শেষ হয়েছিল মাত্র ১৩৫ ওভারে। প্রথম ইনিংসে ৪০ রানে লিড নিয়ে ইংল্যান্ড যে এক উইকেটে ৬৪ রান থেকে ৬ উইকেটে ৮৮ রানে নেমে এসেছিল, তাতে অবাক না হয়ে পারা যায় না। তাও যদি অস্ট্রেলিয়ার বিধ্বংসী তিন পেসার মাঠে থাকত।

হ্যাজেলউড আর কামিংস দলে নেই, এমন অবস্থাতেও ইংল্যান্ড ১৬৪ রানে আউট হয়ে গেল। যত না বোলারদের কৃতিত্ব, তার চেয়ে অনেক বেশী ছিল ইংল্যান্ডের ব্যাটারদের সেই তথাকথিক “বাজবলের” জন্য জঘন্য সব স্ট্রোক। ফল টেস্টের তিনদিন মাঠে পাখি ছাড়া আর কেউ এল না। লক্ষ লক্ষ টাকা নষ্ট হল, টিভি তে খেলা না দেখানোয় আর মাঠের টিকিট বিক্রি না হওয়ায় বাজার অর্থনীতির এক করুণ রূপ উঠে এল। প্রথম টেস্টেই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে বইতে হল প্রায় ১৮ কোটি টাকার ক্ষতি।

দ্বিতীয় টেস্টেও সেই একই ব্যাপার। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ড ৩ উইকেটে ১৭৫ রান থেকে পৌঁছে গেল ৯ উইকেটে ২৬৪ তে। কারণ একটাই, সেই বাজবল বা ময়দানে বহুল প্রচলিত “চালিয়ে খেলার” ফলে। অন্য দিকে অস্ট্রেলিয়া একজনও সেঞ্চুরি না করে, করে ফেলল ৫১১ রান। অবশ্যই তাতে ছিল ইংল্যান্ড দলের ফিল্ডিং এর বদান্যতা।

এমন অবস্থায় টেস্ট খেলার রীতিই ছিল, নিজের উইকেট বাঁচিয়ে ধীর গতিতে রান তোলা আর চেষ্টা করা ক্রিজ আঁকড়ে পরে থাকা। কিন্তু বাজার অর্থনীতির নিয়মে তো তা চলবে না। চার-ছক্কা না মারলে যে মাঠে লোক আসবে না। অতএব দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ড দারুণ শুরুর করে বিনা উইকেটে ৪৭ রান থেকে পৌঁছে গেল ৬ উইকেটে ১২৮ রানে। কী সব জঘন্য স্ট্রোক এল ইংল্যান্ডের প্রথিতযশা ব্যাটার অলি পোপ, হ্যারি ব্রুক আর জেমি স্মিথের কাছ থেকে। কেউ কেউ বলল টি২০-র জনপ্রিয়াতা খেলার আদলই পাল্টে দিয়েছে। চারদিনেই টেস্ট ম্যাচটা জিতে নিল অস্ট্রেলিয়া। তৃতীয় টেস্টটা ছিল ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ বাঁচানোর একমাত্র রাস্তা। চেষ্টা যে একেবারে করেনি ইংল্যান্ড তা নয়। কিন্তু বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচটা পাঁচ দিনে পৌঁছালেও অস্ট্রেলিয়া জিতে নিল লড়াই করে। বলতে গেলে মাত্র ১১ দিনে অ্যাশেজ সিরিজের ফয়সালা হয়ে গেল।

আবার এখানেও দেখা গেল ইংল্যান্ডের নিচের সারির ব্যাটারদের ব্যাট থেকেই এল স্ট্রোকের আর রানের বন্যা। হয়তো দলে বোলার প্যাট কামিংসের অন্তর্ভুক্তি অস্ট্রেলিয়ার বোলিং বিভাগকে একটু জোরালো করেছিল। কিন্তু ইংল্যান্ড তাদের খেলায় টেস্ট ক্রিকেটের সেই ম্যাচ বাঁচানো বা পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করার প্রয়োগ মাঠে দেখাতে পারল না। বা দেখাবার মানসিকতাও দেখা গেল না। তা হলে হয়তো বাজার অর্থনীতির নিয়মানুসারে টেস্টের বাজারি চাহিদার উন্নয়নে অসুবিধা হতো।

চুলোয় যাক ধ্রুপদী টেস্ট ক্রিকেটের অনন্ত আকর্ষণ। চতুর্থ টেস্টে মেলবোর্নের মাঠে অস্ট্রেলিয়া হারল। প্রায় প্রতিদিন ৯৫ হাজার লোকের উপস্থিতিতে খেলা হল মাত্র দু’দিনে। অস্ট্রেলিয়ার খেলা দেখে মনে হল তাদের অ্যাশেজ জয়ের কাজ শেষ, অতএব আর খেলার ইচ্ছাই যেন নেই। কী সব জঘন্য স্ট্রোক এল অস্ট্রেলিয়ার হেড, উসমান খোয়াজা, আলেক্স ক্যারির ব্যাট থেকে। শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়া যখন দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৩২ রানে আউট হতে যাচ্ছে, তখন অবাক হয়ে দেখা গেল অধিনায়ক স্মিথ দশম উইকেটের জুটি করে ঝাই রিচার্ডসনকে বাঁচিয়ে রেখে দলকে এগিয়ে নেওয়ার কোনও চেষ্টাই করল না। এই অস্ট্রেলিয়া কিন্তু প্রথম ইনিংসে ৪২ রানের লিড পেয়েছিল।

ফল হলো ইংল্যান্ড ১৯৩২ সালের পর, অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে এসে কোনও ইনিংসে একজনও ৫০ না করার যে বিখ্যাত রেকর্ড করেছিল, তা নিয়েও দু’দিনে মেলবোর্নের মাঠে টেস্ট জিতল। সব মিলিয়ে ১৮৬০০০ লোকের মত দর্শক হল মাঠে। যথারীতি মেলবোর্নের মাঠের পিচ নিয়ে নানা কথা উঠে এল। কিন্তু কথা উঠল না ব্যাটারদের টেস্ট খেলতে এসে ব্যাটিং করার ভ্রান্ত প্রচেষ্টা নিয়ে। ৮৫২ বলে এই মেলবোর্ন টেস্ট শেষ হওয়ায় অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডকে বইতে হল প্রায় ৬১ কোটি টাকা ক্ষতি। সব মিলিয়ে এবারের সিরিজের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ডকে খোয়াতে হল প্রায় ৭৮ কোটি টাকা। সিডনিতে অনুষ্ঠিত শেষ টেস্টেও অস্ট্রেলিয়া দলে ছিল চমক। কারণ সিডনির চিরকালীন স্পিন সহায়ক পিচে রাখা হল না দলে একজনও স্পিনার। হতে পারে লায়ন আহত ছিল, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কি আর কোনও ভালো মানের স্পিনার ছিল না? সিডনি টেস্ট পাঁচদিন গড়ালেও অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ জিতে নিল ৫ উইকেটে। এই ম্যাচে জো রুটের ১৬০, ট্র্যাভিস হেডের ১৬৩ আর বেথেলের ১৫৪, স্মিথের ১৩৮ রান দর্শকদের কিছু আনন্দ দিলেও টেস্টের সেই ধ্রুপদী রূপ দেখা গেল না।

Ashes Test
শেষ টেস্ট খেলে অবসর নেন উসমান খোয়াজা

সিরিজ হারের পর ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরে মদ খাওয়া বা বউন্সারের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার খবর উঠে আসাটা নতুন কিছু ব্যাপার নয়। কিন্তু “বাজবল” নিয়ে কথা ওঠা কি অনুচিত? ইংল্যান্ডের কোচ ম্যাককালাম যতই এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন না কেন, তার দলের এই স্টাইল আগামী দিনে চালিয়ে যাওয়া নিয়ে কিছু সংশয় যে আছে, তা বোধহয় আর বলে বোঝাতে হবে না। তবে যতদিন না বাজারের চাহিদার নিরিখে ক্রিকেট খেলার কৌশল ঠিক করা বন্ধ হবে, ততদিন হয়তো বাজবলের জায়গায় উঠে আসবে “ফোরসবল” বা “পাঞ্চবল” এমন কিছু। সত্যি কারের টেস্ট ক্রিকেটের সাধ থেকে যাবে অধরাই।

Join WhatsApp

Join Now

Subscribe on Youtube

Join Now

Leave a Comment