বস্টনের মঞ্চে এবার সত্যিই শুরু হতে চলেছে বিশ্বকাপের আসল লড়াই। গ্রুপপর্বের আনুষ্ঠানিকতা প্রায় শেষ পর্যায়ে, নকআউট নিশ্চিত করে ফেলেছে ১৯টি দল। এখন থেকে প্রতিটি ম্যাচ শুধুই বেঁচে থাকার লড়াই নয়, ট্রফির দিকে এগিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ। সেই আবহেই (France vs Norway) ভারতীয় সময় শনিবার রাত ১২:৩০ টায় ফক্সবরোর বস্টন স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল ফ্রান্স ও নরওয়ে। আর এই ম্যাচের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন বিশ্বের দুই সেরা স্ট্রাইকার— কিলিয়ান এমবাপে বনাম আর্লিং হাল্যান্ড।
গ্রুপ আই-এর শীর্ষস্থান নির্ধারণের ম্যাচ
বিশ্বকাপের গ্রুপ আই-এ নিজেদের প্রথম দুটি ম্যাচ জিতে ইতিমধ্যেই গ্রুপের প্রথম দুটি জায়গা নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স ও নরওয়ে। সেনেগাল এবং ইরাককে হারিয়ে দু’দলই ছয় পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে। তবে গোল পার্থক্যে (+৫) এগিয়ে রয়েছে ফ্রান্স, ফলে ড্র করলেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের রাউন্ডে অর্থাৎ রাউন্ড ৩২-এ যাবে লে ব্লু।
অন্যদিকে, নরওয়ের সামনে সুযোগ ইতিহাস গড়ার। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে উঠে এসে স্টালে সোলবাকেনের দল ইতিমধ্যেই চমকে দিয়েছে ফুটবল বিশ্বকে।
এমবাপে বনাম হাল্যান্ড: গোল্ডেন বুটের মহাযুদ্ধ
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গোলস্কোরার তালিকায় এই মুহূর্তে শীর্ষে রয়েছেন লিওনেল মেসি। তার ঠিক পিছনেই যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে আছেন কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হাল্যান্ড এবং ভিনিসিয়াস জুনিয়র, প্রত্যেকের ঝুলিতে চারটি করে গোল।
হাল্যান্ড ইতিমধ্যেই ইরাকের বিরুদ্ধে দুই গোল এবং সেনেগালের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে নিজের ফর্মের জানান দিয়েছেন। অন্যদিকে, ফ্রান্সের অধিনায়ক এমবাপেও চার গোল করে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের রাজত্ব বজায় রেখেছেন। এই ম্যাচ তাই শুধু দলের লড়াই নয়, গোল্ডেন বুটের দৌড়েও বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে।
Pas de meilleur cadeau qu’une qualification pour fêter ma 100e sélection avec notre sélection. Nous sommes sur le bon chemin et allons continuer à vous rendre fiers.
— Kylian Mbappé (@KMbappe) June 23, 2026
🇫🇷🙏🏽💯 @equipedefrance pic.twitter.com/Pqc1cDzDpb
‘ফ্রান্সই বিশ্বকাপ জিতবে’— নিজের দল নিয়েই বিস্ফোরক মন্তব্য হাল্যান্ডের
সেনেগালকে হারানোর পর মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আর্লিং হাল্যান্ডের সোজাসাপটা মন্তব্য ইতিমধ্যেই ভাইরাল।(France vs Norway) “আমরা নকআউটে উঠে গেছি, এটাই অবিশ্বাস্য। সত্যি বলতে, ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে খুব একটা ভাবছি না। ওরা সম্ভবত আমাদের হারাবে, হয়তো পুরো বিশ্বকাপটাই জিতবে।”
তবে হাল্যান্ডের এই মন্তব্যকে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখতে নারাজ ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। কারণ, আক্রমণে নরওয়ে এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের চেয়েও বেশি গোল করেছে।
ফ্রান্সের আক্রমণভাগ: এমবাপেকে ঘিরে তারকাদের সমারোহ
২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালের রানার্স ফ্রান্স এবারও অন্যতম শিরোপা দাবিদার। কিলিয়ান এমবাপের পাশাপাশি দলে রয়েছেন উসমান দেম্বেলে, ব্র্যাডলি বারকোলা, দেসিরে দুয়ে, মাইকেল ওলিসে এবং রায়ান শেরকির মতো বিস্ফোরক আক্রমণভাগের ফুটবলার। ইরাকের বিরুদ্ধে ম্যাচে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেন দেম্বেলে। পাশাপাশি দুটি অ্যাসিস্ট করেন ওলিসে। ফলে এমবাপে-দেম্বেলে-অলিসে ত্রয়ী এখন প্রতিপক্ষের কাছে বড় আতঙ্ক।
A moment of reflection before training. Our thoughts are with you, coach 💙 pic.twitter.com/cj5cYWx42R
— French Team ⭐⭐ (@FrenchTeam) June 24, 2026
আরও পড়ুন :- বিশ্বকাপে নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’, মাঠ পেরিয়ে বিশ্ব জুড়ে ভাইরাল হাল্যান্ডদের উদযাপন
নরওয়ের স্বপ্নযাত্রা: হাল্যান্ড-ওডেগার্ডদের নতুন যুগ
নরওয়ে ইতিমধ্যেই সাতটি গোল করেছে এই বিশ্বকাপে। হাল্যান্ডের পাশাপাশি আলেকজান্ডার সরলথ ও আন্তোনিও নুসার গতিময় আক্রমণ যথেষ্ট কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
মিডফিল্ডে দলের মস্তিষ্ক মার্টিন ওডেগার্ড, আর ডিফেন্সের সামনে স্যান্ডার বের্গের উপস্থিতি দলকে ভারসাম্য দিয়েছে। কোচ স্টালে সোলবাকেনের আক্রমণাত্মক ৪-৩-৩ ফর্মেশন এই বিশ্বকাপে অন্যতম আকর্ষণীয় কৌশল হিসেবে উঠে এসেছে।
🚨🇳🇴 𝐎𝐅𝐅𝐈𝐂𝐈𝐀𝐋 | Norway have qualified for the knockout stages of the World Cup! 🏆✅
— EuroFoot (@eurofootcom) June 23, 2026
It's the first time in 28 YEARS that they will play knockout football at the World Cup. ✨ pic.twitter.com/qkVOPPwxzm
দেশঁ নেই, তবু আত্মবিশ্বাসী ফ্রান্স
(France vs Norway) ফ্রান্স শিবিরে অবশ্য বড় ধাক্কা এসেছে ম্যাচের আগে। দলের প্রধান কোচ দিদিয়ের দেশঁ-র মা প্রয়াত হওয়ায় তিনি দেশে ফিরে গিয়েছেন। ফলে এই ম্যাচে ফ্রান্সের দায়িত্ব সামলাবেন সহকারী কোচ গি স্তেফান। তবে ফরাসি দলের স্কোয়াডের গভীরতা এতটাই শক্তিশালী যে, কয়েকটি পরিবর্তন হলেও তাদের শক্তি কমার সম্ভাবনা নেই।
গ্রুপে দুই দলের পারফরম্যান্স
ফ্রান্স
- বনাম সেনেগাল: ৩-১ জয়
- বনাম ইরাক: ৩-০ জয়
- গোল পার্থক্য: +৫
নরওয়ে
- বনাম ইরাক: ৪-১ জয়
- বনাম সেনেগাল: ৩-২ জয়
- গোল পার্থক্য: +৪
হেড টু হেড: (France vs Norway) কারা এগিয়ে?
গত ১০৩ বছরে দুই দল মোট ১৫ বার মুখোমুখি হয়েছে।
- ফ্রান্স জিতেছে: ৭ ম্যাচ
- নরওয়ে জিতেছে: ৪ ম্যাচ
- ড্র: ৪ ম্যাচ
বিশ্বকাপ বা বড় টুর্নামেন্টে এই প্রথমবার মুখোমুখি হচ্ছে দুই দেশ। শেষ সাক্ষাতে (France vs Norway) ২০১৪ সালে ফ্রান্স ৪-০ গোলে জিতেছিল, যেখানে জোড়া গোল করেছিলেন অলিভিয়ে জিরু।
সম্ভাব্য একাদশ
নরওয়ে (৪-৩-৩): নাইল্যান্ড; পেডারসেন, আজের, হেগেম, মোলার উলফে; আউর্সনেস, বের্গে, ওদেগার্ড; নুসা, হলান্ড, সরলথ।
ফ্রান্স (৪-৩-৩): মেনিয়াঁ; কুন্দে, সালিবা, উপামেকানো, থিও হার্নান্দেজ; চুয়ামেনি, কান্তে, রাবিও; দেম্বেলে, এমবাপে, বারকোলা।
Your combined Norway vs France XI is simply put…not very combined at all 😂
— OneFootball (@OneFootball) June 25, 2026
There wasn't even space for Erling Haaland in your team ❌🤖 pic.twitter.com/CoECphiZzA
কী হতে পারে ম্যাচের ফল?
নরওয়ের আক্রমণভাগ যেমন দুর্ধর্ষ, তেমনই তাদের রক্ষণভাগ এখনও দুর্বলতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা ও স্কোয়াড ডেপথ বিশ্বসেরাদের পর্যায়ে।
তবু হাল্যান্ড বনাম এমবাপের লড়াইয়ে একতরফা ফলের সম্ভাবনা কম। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই (France vs Norway) ম্যাচটি হতে পারে বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপপর্বের সেরা ম্যাচগুলির একটি।
(France vs Norway) কারা এগিয়ে? অভিজ্ঞতার ফ্রান্স নাকি ক্ষুধার্ত নরওয়ে
কাগজে-কলমে ফ্রান্সই এই ম্যাচের ফেভারিট। শেষ তিনটি বিশ্বকাপের মধ্যে দু’বার ফাইনালে খেলা দল, একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং একবার রানার্স-আপ হওয়া লে ব্লুদের বড় মঞ্চে পারফর্ম করার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। কিলিয়ান এমবাপের নেতৃত্বে তারা জানে, বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে প্রতিটি মুহূর্ত কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
তবে অন্যদিকে দাঁড়িয়ে থাকা নরওয়েকে মোটেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরে আসা দলটি ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে তারা শুধুই অংশ নিতে আসেনি, লড়াই করতে এসেছে। আর্লিং হাল্যান্ড, মার্টিন ওডেগার্ড, আলেকজান্ডার সরলথদের নিয়ে গড়া এই নতুন নরওয়ে দল ইউরোপীয় ফুটবলের নতুন শক্তি হয়ে ওঠার বার্তা দিয়েছে।
একদিকে বিশ্বকাপের মঞ্চে বহু যুদ্ধ জেতা ফ্রান্সের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে নিজেদের সামর্থ্য বিশ্বকে দেখানোর ক্ষুধায় মরিয়া নরওয়ে। তাই শনিবার বস্টনের মাঠে শুধুমাত্র এমবাপে বনাম হাল্যান্ডের ব্যক্তিগত দ্বৈরথ নয়, মুখোমুখি হবে অভিজ্ঞতা বনাম উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ঐতিহ্য বনাম নতুন স্বপ্ন। আর সেই কারণেই এই ম্যাচটিকে শুধু গ্রুপের শীর্ষস্থান নির্ধারণের লড়াই নয়, বরং বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের আগে দুই সম্ভাব্য দাবিদারের শক্তি পরীক্ষার মঞ্চ হিসেবেও দেখছেন ফুটবলপ্রেমীরা।
আরও পড়ুন :- ৪১ বছরেও সুপারফিট রোনাল্দো, বিশ্বকাপের জন্য কী তাঁর সিক্রেট প্ল্যান?

