কুশল চক্রবর্তী
সামনেই আসছে ফুটবল বিশ্বকাপ। সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমী মানুষ যখন আমেরিকা, কানাডা আর মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা করছে, তখন ভারতের কোটি কোটি ফুটবল প্রেমী মানুষ হতাশা নিয়ে ভাবছে এবারের ভারতীয় ক্লাব ফুটবলের সেরা প্রতিযোগিতা ISL হবে কি হবে না। প্রতিদিন নানা রকমের মুখরোচক সংবাদ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। আইএসএল নিয়ে নানা বিভ্রান্তিমূলক খবর ফুটবলপ্রেমী মানুষকে করে তুলছে এই প্রতিযোগিতার প্রতি নিরাসক্ত। আসলে এই আইএসএল না হবার মূল সমস্যা হচ্ছে উপযুক্ত অর্থের অভাব। অদ্ভুতভাবে এবার দেখা গেছে রিলায়েন্স গোষ্ঠীর এফএসডিএলের সঙ্গে চুক্তি শেষ হবার পর আর কেউ এই লিগ চালাবার জন্য টাকা ঢালতে চাইছে না। আসুন একটু পিছন ফিরে দেখা যাক এই সমস্যার ইতিহাসটা।
সেটা ২০১০ সালের কথা, ভারতীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা এআইএফএফের প্রেসিডেন্ট তখন প্রফুল প্যাটেল আর সম্পাদক কুশল দাস। ৯ ডিসেম্বর ২০১০ সালে প্রায় সমস্ত পত্রপত্রিকায় সহাস্য ছবি বেরিয়েছিল প্রেসিডেন্ট মহাশয়ের, যেন তিনিই রিলায়েন্স গ্রুপের সঙ্গে ১৫ বছরের ৭০০ কোটি টাকার চুক্তি করে ভারতীয় ফুটবলকে বাঁচিয়ে দিলেন বা আগামী দিনে ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণোজ্জ্বল ভবিষ্যতের সূচনা করলেন। আজ ১৫ বছর পরে বোঝা যাচ্ছে এফএসডিএলের প্রবেশ কীভাবে ভারতীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থাকে অকেজো করে তুলেছে।
আর কলকাতায় হবে না ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ? ISL নিয়ে কী সিদ্ধান্ত
প্রফুল প্যাটেল বা কুশল দাস তাদের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে উঠে এসেছে নানা আপত্তিকর অভিযোগ, এটা বললে বোধহয় ভুল হবে না। শুধু তাই নয় প্রফুল প্যাটেল, তাঁর অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন একটি রাজ্যে শাসক দলকে সমর্থনের পর। আর কুশল দাস তো শারীরিক কারণের দোহাই দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন সম্পাদকের পদ থেকে তার কর্মকাল শেষ হবার আগেই।
অতএব এই যে রিলায়েন্স গোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে কি অবাক হতে হবে? আজ যখন রিলায়েন্স গোষ্ঠীর এফএসডিএলের চুক্তি ৮ই ডিসেম্বর ২০২৫ সালে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন অন্য কোনও গোষ্ঠী যে এই আইএসএল করতে এগিয়ে আসছে না। এই পরিস্থিতিকে যদি ভারতের অন্যতম সর্ববৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর পিছন থেকে “কলকাঠি নাড়া” বলে সন্দেহ করা হয় তবে কি একবার বাজে কথা বলা হবে? অন্য দিকে এই এআইএফএফ ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল অবধি যখন ধুমধাম করে আইলিগ পরিচালনা করত, তখন তো অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিরা এগিয়ে আসত এই প্রতিযোগিতাকে সফল করতে, তারা আজ কেন এগিয়ে আসছে না। যে রিলায়ন্স গোষ্ঠী আইএসএলে বিনিয়োগের ফলে তাদের ৫০০০ কোটি টাকা লোকসানের কথা বলছে তারা কি একবারও বলেছে এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে নাম জড়িয়ে তাদের ব্যবসায়ে কী পরিমাণ লাভ হয়েছে? নাকি এই লোকসানের মধ্যে ২০১০ সালে এআইএফএফের সঙ্গে চুক্তি করার সময় কিছু লোককে “খুশী” করার টাকাও ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে এই মুহূর্তে যারা ভারতীয় ফুটবলের কর্তা হয়ে বসে আছেন, তাদের কাজের “অসাধারণ পারদর্শিতা” নিয়ে অনেক কথাই বলা যেতে পারে। তাঁরা তো জানত ৮ ডিসেম্বরের ২০২৫-এর পর এফএসডিএল আর থাকবে না। তবে কেন শুধু তাঁরা ২০২৪ সালের শেষ থেকে চিঠি চাপাটি করেই চুপচাপ বসে থাকল? যে কোনও সাফল্যের মুখ দেখা পরিকল্পনায় একের অধিক ধাপ থাকে। এখানে এমন কোনও “বি” বা “সি” পরিকল্পনা ছিল বলে তো মনে হয় না। নাকি এআইএফএফের এখনকার কর্তারাও চাইছিল একটু টালবাহানা করে যেন এফএসডিএলের হাতেই আইএসএলটা তুলে দেওয়া যায়। কারন তাতে যেমন একদিকে পায়ের উপর পা তুলে বেশ কিছু টাকা এআইএফএফের ঘরে চলে আসবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের অঙ্গুলি হেলনে যারা প্রশাসনিক কর্তা হয়ে উঠেছেন, তাদের সেই রাজনৈতিক দলের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা দেখানও হয়ে যাবে। আর রিলায়েন্স গোষ্ঠী যে ভারতীয় শাসক দলের প্রিয়পাত্র সে তো বলাই বাহুল্য।

