৩৯ বছর বয়সে একজন ফুটবলারের কাছে সাধারণত প্রত্যাশা থাকে সীমিত (Lionel Messi Hattrick)। হয়তো কিছু সময় মাঠে থাকা, সুযোগ পেলে গোলের চেষ্টা করা কিংবা অভিজ্ঞতা দিয়ে দলকে সাহায্য করা। কিন্তু যখন সেই ফুটবলারের নাম লিওনেল মেসি, তখন সব হিসাবই বদলে যায়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন—বয়স কেবল একটি সংখ্যা, প্রতিভা ও ক্ষুধা এখনও অটুট।
ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ম্যাচের সময়সূচি। কখনও রাত সাড়ে ১০টা, কখনও গভীর রাত, আবার কখনও ভোরবেলা। তেমনই এক ম্যাচে ভোর সাড়ে ৬টায় মাঠে নামে আর্জেন্তিনা। প্রতিপক্ষ আলজিরিয়া। আর যারা ঘুম ভেঙে ম্যাচটি দেখেছিলেন, তারা প্রত্যক্ষ করলেন মেসির আরেকটি মাস্টারক্লাস।
আলজিরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্তিনা। তিনটি গোলই করেছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হলো তাঁর দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক দিয়ে।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। প্রথম পাঁচ মিনিটেই মেসি বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর একই কারণে আলজিরিয়ার একটি গোলও বাতিল হয়।
অবশেষে ১৭ মিনিটে আসে ম্যাচের প্রথম বৈধ গোল। মাঝমাঠ থেকে রদ্রিগো ডি পলের পাস পেয়ে নিজের চেনা ভঙ্গিতে এগিয়ে যান মেসি। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া তাঁর বাঁ-পায়ের শক্তিশালী শট ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান। কিন্তু বল তাঁর হাত ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়।
বিশেষ এই ম্যাচটি ছিল আর্জেন্তিনার জার্সিতে মেসির ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। একই সঙ্গে এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ১১৮তম এবং বিশ্বকাপে ১৪তম গোল।
প্রথম গোলের পর আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিল আর্জেন্তিনা। তবে কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট শট, কখনও লুকা জিদানের সেভে গোলের সংখ্যা বাড়েনি। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
দ্বিতীয়ার্ধে দলকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। নাহুয়েল মোলিনা, জুলিয়ান আলভারেজ ও নিকোলাস গনসালেসকে নামিয়ে ম্যাচের গতিই বদলে দেন তিনি।
৬০ মিনিটে আসে মেসির দ্বিতীয় গোল। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হন লুকা জিদান। ফিরতি বল ডিফেন্ডারদের আগেই পেয়ে যান মেসি। মুহূর্তের মধ্যে ডান পায়ের শটে বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আর্জেন্তাইন অধিনায়ক।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৫-তে নিয়ে যান মেসি। ছুঁয়ে ফেলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওর বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড।
ছয় মিনিট পর আবারও গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। তবে এবার তাঁর দূরপাল্লার শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন জিদান। কিন্তু সেটি কেবল সময়ের ব্যবধান বাড়িয়েছে।
৭৬ মিনিটে পূর্ণতা পায় মেসি-শো। দূরপাল্লার আরেকটি দুর্দান্ত শটে হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন তিনি। এটিই ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬। ফলে তিনি স্পর্শ করেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ডকেও।
ম্যাচের ৮০ মিনিটে দর্শকদের দাঁড়িয়ে অভিবাদনের মধ্যে মাঠ ছাড়েন মেসি। ততক্ষণে যা করার, সবই করে ফেলেছেন তিনি। তিনটি গোল, অসংখ্য মুহূর্তের জাদু এবং আরেকটি স্মরণীয় রাত উপহার দিয়েছেন ফুটবলপ্রেমীদের।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ যেখানে শেষ করেছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ ঠিক সেখান থেকেই শুরু করলেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার স্বপ্নযাত্রাও শুরু হলো তাঁর জাদুকরি পা ছুঁয়ে।

