কলকাতার ক্রীড়া মানচিত্রে এমন কিছু জায়গা আছে, যেগুলো শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়—সেগুলো স্মৃতি, আবেগ, ইতিহাস আর প্রজন্মের স্বপ্নে গড়া। রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়াম (Rabindra Sarobar Stadium) ঠিক তেমনই এক নাম। বহু দশক ধরে এই মাঠ দেখেছে ফুটবলের উন্মাদনা, অ্যাথলেটিক্সের ঘাম, টেবিল টেনিসের জন্ম, সাংস্কৃতিক আসর আর আন্তর্জাতিক তারকাদের পদচারণা। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালটা যেন অন্যরকম ছিল। স্টেডিয়ামের গেটে তালা ঝুলল। একের পর এক ঘর বন্ধ হয়ে গেল। থেমে গেল অনুশীলন। আর শুরু হল নতুন বিতর্ক—এ কি শেষ, না নতুন শুরুর প্রস্তুতি?
রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামকে (Rabindra Sarobar Stadium) দখলমুক্ত করে নতুনভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই আপাতত স্টেডিয়ামের একাধিক অংশ এবং ক্লাবঘরে তালা লাগানো হয়েছে। ক্রীড়া দপ্তরের কর্তারা এসে কার্যত নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন।
সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্টেডিয়ামের বহু ঘর এমন বিভিন্ন সংস্থা ও ক্লাবের দখলে ছিল, যাদের অনেকের সক্রিয় ক্রীড়া কার্যক্রম প্রায় নেই বললেই চলে। যদিও বহু ক্লাবের দাবি, সব সংস্থাকে একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়ায় প্রকৃত ক্রীড়াবিদ ও অনুশীলনকারীরাই সমস্যায় পড়ছেন।
রবীন্দ্র সরোবরের বর্তমান চেহারা ঘুরে দেখতে গিয়ে আরও একটি বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—খেলার জায়গায় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের উপস্থিতি। স্টেডিয়ামের একাধিক ঘরের সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদের সংগঠনের নাম, ছবি এবং প্রভাবের ছাপ চোখে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের সদস্য অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি, কোথাও আবার প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের উপস্থিতির চিহ্ন। কালীঘাট মিলন সংঘ, সুরুচি সংঘ-সহ কয়েকটি ক্লাব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবের আলোচনা ছিল ক্রীড়ামহলে। যদিও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে নতুন প্রশাসনের দাবি, মাঠ এবং ক্লাব পরিকাঠামোকে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে এনে সম্পূর্ণভাবে খেলাধুলা ও ক্রীড়াবিদদের জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য।
এই স্টেডিয়ামের (Rabindra Sarobar Stadium) ঘর ব্যবহার করত কালীঘাট স্পোর্টস লাভার অ্যাসোসিয়েশন, সুরুচি সংঘ, সাদার্ন সমিতি, কালীঘাট মিলন সংঘ-সহ একাধিক ক্লাব ও সংগঠন। মোট ২২টিরও বেশি ক্লাব এবং অন্যান্য সংস্থা এখানে কার্যক্রম চালাত বলে জানা গিয়েছে। এখন তাদের অধিকাংশই তালাবন্দি।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অনুশীলন ঘিরে। কারণ, কলকাতা লিগ শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। নিয়মিত অনুশীলন করা বহু ফুটবলার, কোচ এবং কর্মী এখন অপেক্ষায়—সরকার অন্তত মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দেয় কি না। সাদার্ন সমিতির কর্তা সৌরভ পাল জানিয়েছেন, অতীতে সরকারি সুযোগের অপব্যবহার হয়ে থাকলে তা বন্ধ হওয়া উচিত, তবে নিয়মিত খেলা ও অনুশীলনের জন্য ক্লাবগুলিকে সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হবে।
তবে এই ঘটনাকে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে দেখলে ভুল হবে। কারণ রবীন্দ্র সরোবরের গল্প অনেক বড়। একটা সময় এই স্টেডিয়াম ছিল কলকাতার ক্রীড়া সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এখানেই অনুশীলন করে এশিয়ার মঞ্চে নাম করেছিলেন অ্যাথলিট রীতা সেন, সুব্রতা দেবনাথরা। এখানেই আয়োজিত টেবিল টেনিস ক্যাম্প থেকে উঠে এসেছিলেন ভারতের পরিচিত টিটি তারকা পৌলমী ঘটক।
ফুটবলেও এই মাঠের স্মৃতি গভীর। অমল দত্তের টালিগঞ্জ অগ্রগামী যখন জাতীয় লিগে আলোড়ন তুলছিল, তখন তাদের ড্রেসিংরুম ছিল এখানেই। চুনী গোস্বামীদের সময়ের বহু স্মরণীয় ম্যাচের সাক্ষী এই মাঠ। বিদেশি দল, ইরান, রাশিয়া, তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ার ফুটবলারদের খেলাও দেখেছে রবীন্দ্র সরোবর।
শুধু খেলাই নয়—এই মাঠের গ্যালারি একসময় হয়ে উঠেছিল শহরের সাংস্কৃতিক মিলনস্থলও। এখানে অনুষ্ঠান করেছেন মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকরের মতো কিংবদন্তিরা। আর ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তগুলোর একটি—মানবজাতির প্রথম মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন কলকাতায় এসে এই মাঠেই (Rabindra Sarobar Stadium) গণসংবর্ধনা পেয়েছিলেন। একইভাবে কিংবদন্তি দীর্ঘদৌড়বিদ এমিল জাটোপেক এর উপস্থিতিও একসময় গর্বের স্মৃতি হয়ে আছে এই স্টেডিয়ামের সঙ্গে।
সময় বদলেছে। অবকাঠামো পুরোনো হয়েছে। মরচে পড়েছে গেটে। ভেঙে পড়েছে কাউন্টার। কয়েক বছর আগে আইএসএলের জন্য অস্থায়ীভাবে ফ্লাডলাইট বসানো হলেও পরে পরিবেশগত আপত্তিতে তা সরিয়ে ফেলতে হয়।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই তালা কি কেবল বন্ধ হওয়ার প্রতীক, নাকি পুনর্জন্মের দরজা?
রাজ্যের নতুন ক্রীড়ামন্ত্রীর পরিকল্পনায় নাকি রয়েছে আধুনিক অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের ট্র্যাক এবং সম্পূর্ণ নতুন রূপে স্টেডিয়ামকে ফিরিয়ে আনার ভাবনা। যদি সত্যিই তা বাস্তবায়িত হয়, তবে হয়তো আবার একদিন রবীন্দ্র সরোবরে শোনা যাবে বাঁশির শব্দ, দেখা যাবে ফুটবল বুটের ছাপ, ট্র্যাকে দৌড়বে নতুন প্রজন্ম।
আজ রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামের (Rabindra Sarobar Stadium) গেটে তালা ঝুলছে। করিডোরে নেই সেই চেনা হাঁকডাক, মাঠে নেই অনুশীলনের শব্দ। কিন্তু ইতিহাসের এমন জায়গা কখনও শুধু বন্ধ হয়ে যায় না—সে অপেক্ষা করে। বহু স্মৃতি, বহু আক্ষেপ আর হারানো গৌরব বুকে নিয়ে রবীন্দ্র সরোবর যেন আজ নতুন প্রাণের অপেক্ষায়। যদি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে হয়তো আবার একদিন এই মাঠেই ফিরবে দর্শকের গর্জন, ফুটবলের ছন্দ আর নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন।
শেষ কবে ন্যাশনাল লিগ জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল? কী হয়েছিল ফলাফল? ফিরে দেখুন ২২ বছর আগের ঘটনা

