মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় অশান্তির ঘটনার তদন্তভার জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা NIA- এর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই ঘটনাকে ঘিরে কেন্দ্র ও রাজ্যের টানাপোড়েন এবার পৌঁছল সুপ্রিম কোর্টে। রাজ্যের আবেদনে কার্যত জল ঢেলে দিয়ে বুধবার শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, NIA তদন্তে তারা হস্তক্ষেপ করবে না। তবে UAPA-র ১৫ নম্বর ধারা প্রয়োগের প্রশ্ন ছুড়ে দিল কলকাতা হাই কোর্টের তরফে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ জানায়, প্রায় এক মাস আগে NIA-কে তদন্তভার দেওয়া হয়েছে এবং সংস্থা ইতিমধ্যেই এফআইআর দায়ের করেছে। এই অবস্থায় তদন্ত আটকে দেওয়ার কোনও কারণ দেখছে না সুপ্রিম কোর্ট। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণ, UAPA-র মতো কড়া আইনের ধারা ১৫ প্রয়োগ করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
NIA-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট মুখবন্ধ খামে কলকাতা হাই কোর্টে জমা দিতে হবে। সেখানে স্পষ্ট করতে হবে, আদৌ UAPA প্রয়োগের মতো কারণ রয়েছে কি না।
বেলডাঙার অশান্তি নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অন্যতম আবেদনকারী ছিলেন। সেই মামলায় প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের বেঞ্চ কেন্দ্রকে NIA তদন্তের সবুজ সঙ্কেত দেয়। প্রয়োজনে রাজ্যকে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী চাওয়ার পরামর্শও দেয়। সেই নির্দেশের বিরুদ্ধেই সুপ্রিম কোর্টে যায় নবান্ন।
শুনানিতে NIA-র আইনজীবী অভিযোগ করেন, হাই কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার এখনও পর্যন্ত তদন্তের সম্পূর্ণ নথি সংস্থার হাতে তুলে দেয়নি। পাল্টা রাজ্যের দাবি, বেলডাঙার হিংসায় পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। ৩৩ জন কে জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেফতার করা হয়। একই সঙ্গে রাজ্যের কটাক্ষ, পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য যেখানে NIA প্রায়শই সক্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে কেন্দ্র ও NIA আদালতে যুক্তি দেয়, বেলডাঙা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে হওয়ায় এলাকাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অশান্তির সময় বহু দোকান পোড়ানো হয়েছে, ব্যবহার হয়েছে প্রাণঘাতী অস্ত্র। NIA স্বাধীনভাবে তদন্ত করছে বলেও জানানো হয়। পাশাপাশি অভিযোগ তোলা হয়, রাজ্য পুলিশ ইচ্ছাকৃত ভাবে নথি হস্তান্তরে গড়িমসি করছে।
UAPA-র ১৫ নম্বর প্রয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। তাঁর বক্তব্য, “প্রত্যেক উত্তেজিত ঘটনাকে দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার হুমকির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায় না। বিস্ফোরক ব্যবহার না হলে এবং দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্য প্রমাণিত না হলে, UAPA ধারা ১৫ প্রয়োগের যুক্তি দাঁড়ায় না।” অভিযোগ ওঠে, NIA নথি খুঁটিয়ে না দেখেই ওই ধারা বসিয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত বৈধ কি না, তা নির্ধারণ করবে কলকাতা হাই কোর্ট।
প্রসঙ্গত, ১৫ জানুয়ারি ঝাড়খণ্ডে বাংলার এক পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বেলডাঙায় অশান্তি ছড়ায়। রেল অবরোধ, জাতীয় সড়ক অবরোধ, দোকান পোড়ানো, সাংবাদিকদের উপর হামলার মতো ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়। রাজ্য পুলিশ প্রথমে তদন্ত শুরু করলেও, হাই কোর্টের নির্দেশে মামলার তদন্তভার যায় NIA-র হাতে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বেলডাঙা হিংসা আর শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার ইস্যু নয়। এটি এখন কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের আরেকটি ময়দান, যেখানে তদন্তের দায়িত্ব ঘিরেই মূল লড়াই।
