রথের মেলা, পৌষমেলা, রাসের মেলা তো অনেক গেছেন। তবে মাছের মেলা গেছেন কখনও? কী ভাবছেন মাছের আবার মেলা হয় নাকি, মাছ তো রোজ বাজার থেকে কেনেন। না না মশাই কোনও গল্পকথা নয়, মাছের মেলাও হয়। তাও আবার প্রায় ৫০০ বছর পুরোনো।
প্রতি বছর মাঘের প্রথম দিনে হুগলির দেবানন্দপুরের কেষ্টপুরে বসে এই মেলা। ঘুম থেকে উঠেই দলে দলে মানুষ ছুটে আসেন শতাব্দীপ্রাচীন মাছের মেলায়। রাঘব বোয়াল থেকে শুরু করে টুনা, লালমোহন, শংকর, কাতলা, রুই, ভেটকি, ইলিশ কী নেই সেখানে! চোখের নিমেষে ফুরিয়ে যায় হাজার হাজার কেজি মাছ। ক্রেতাদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। Fish Fair
আনুমানিক ৫১৯ বছরের পুরনো এই মেলা রঘুনাথ দাস গোস্বামীর বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় বসে। মাছের পাশাপাশি মেলায় সাজানো থাকে নানা রকম দোকান। জিলিপি, বাদাম, ঝুড়ি, পিঁড়ি, কুলো থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। মাছ কিনে অনেকে পাশে অস্থায়ী উনুন বানিয়ে মাছ ভাজা দিয়ে পিকনিক করছেন। অনেক দোকানে আবার মাছ ভেজে বিক্রিও করা হচ্ছে। এ বছরের মেলায় আকর্ষণের শেষ নেই। কোথাও ৫০ কেজি ওজনের শংকর, কোথাও ৩৫ কেজির কাতলা, আবার ৪০ কেজির ভোলা বা প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা বাইন মাছ দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন ক্রেতারা, কারণ এমন মাছ তো আর রোজ একসঙ্গে চোখে দেখা যায় না।
এই মাছের মেলার পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ ইতিহাস। কেষ্টপুরের তৎকালীন জমিদার গোবর্ধন গোস্বামীর ছেলে রঘুনাথ দাস গোস্বামী সন্ন্যাস গ্রহণ করে সংসার ত্যাগ করেছিলেন। তিনি ছিলেন চৈতন্য মহাপ্রভুর শিষ্য। মাত্র ১৫ বছর বয়সে নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে দীক্ষা নিতে পানিহাটিতে গেলেও তখন দীক্ষা পাননি। দীর্ঘ নয় মাস পর তিনি বাড়ি ফিরে এলে সেই আনন্দে গোবর্ধন গোস্বামী গ্রামবাসীদের ভোজন করানোর সিদ্ধান্ত নেন। ভক্তদের আবদারে কাঁচা আমের ঝোল ও ইলিশ মাছের ব্যবস্থা করা হয়। বাড়ির পাশের জলাশয়ে জাল ফেলতেই অলৌকিকভাবে প্রচুর মাছ ধরা পড়ে। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই শুরু হয় মাছের মেলা। Fish Fair
আজও সেই ঐতিহ্য অটুট। প্রতি বছর এই দিনে রাধাগোবিন্দ মন্দিরে পুজো দিতে ভক্তদের ভিড় জমে। পাশাপাশি হুগলি-সহ বর্ধমান, হাওড়া, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও বাঁকুড়া থেকে মাছ ব্যবসায়ীরা মেলায় অংশ নিতে আসেন। অনেক পরিবার মেলা থেকে মাছ কিনে পাশের আমবাগানে বনভোজনের আনন্দও উপভোগ করেন।
সব মিলিয়ে একদিনের এই মাছের মেলা যেন কেষ্টপুরের এক বড়সড় মোচ্ছব। শতাব্দী পেরিয়েও ঐতিহ্য, ইতিহাস আর মাছের স্বাদ তিনের মিলনে কেষ্টপুরের মাছের মেলা আজও সমান জনপ্রিয়।

