Site icon Hindustan News Point

গণতন্ত্রের মুখে নতুন ছায়া, SIR

special intensive revision

গৌতম ভৌমিক
গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য তার সর্বজনীন অংশগ্রহণে। এই ব্যবস্থার প্রাণশক্তি নিহিত সেই বিশ্বাসে—রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক, তার সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ভাষা, ধর্ম কিংবা পরিচয় নির্বিশেষে, সমানভাবে শাসনপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অধিকার রাখে। এই অংশগ্রহণের সবচেয়ে মৌলিক ও শক্তিশালী মাধ্যম হলো ভোটাধিকার। ভোট দেওয়ার অধিকার মানে শুধু একটি বোতামে চাপ দেওয়া নয়; এটি নিজের অস্তিত্ব, নিজের মতামত ও নিজের নাগরিক সত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঘোষিত Special Intensive Revision (SIR) নামক উদ্যোগটি সেই মৌলিক অধিকারকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নামের আড়ালে থাকা ‘বিশেষ’ ও ‘নিবিড়’ শব্দদুটি যতটা আশ্বাস দেয়, বাস্তব প্রয়োগের ইঙ্গিত ততটাই উদ্বেগজনক, সন্দেহজনক এবং অনেকের কাছে ভীতিকর।

সরকারি ভাষ্যে বলা হচ্ছে, SIR-এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকার শুদ্ধতা রক্ষা করা। নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভুয়ো ভোটার বাদ দেওয়া জরুরি। একটি নির্ভুল ও নিখুঁত ভোটার তালিকা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্ত। কিন্তু যে কোনও প্রশাসনিক উদ্যোগের মতোই এখানে মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্যবস্তু কারা? অভিজ্ঞতা ও পূর্ববর্তী নানা উদাহরণ আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, এই ধরনের ‘বিশেষ’ সংশোধনী প্রক্রিয়ার আঘাত সাধারণত সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষদের উপরেই নেমে আসে। পরিযায়ী শ্রমিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, দরিদ্র মানুষ, বস্তিবাসী, গৃহহীন নাগরিক, এমনকি বহু ক্ষেত্রে নারী ও প্রবীণরাই এই ‘নিবিড় নজরদারি’র প্রথম শিকার হন। যাঁদের কণ্ঠ এমনিতেই ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছায় না, SIR যেন সেই কণ্ঠকে আরও স্তব্ধ করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে।

একজন পরিযায়ী দিনমজুরের কথা ভাবা যাক। কাজের সন্ধানে যিনি এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে ঘুরে বেড়ান, নির্মাণস্থল, কারখানা বা কৃষিক্ষেতে শ্রম দিয়ে সংসার চালান। তাঁর পক্ষে স্থায়ী ঠিকানা বজায় রাখা কতটা সম্ভব? জন্মসনদ, বিদ্যুৎ বিল, ভাড়ার চুক্তিপত্র কিংবা আধুনিক পরিচয়পত্র—এই সব নথিপত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা তাঁর জীবনের অগ্রাধিকার তালিকায় কোথায় স্থান পায়? আবার একজন বস্তিবাসীর কথা ভাবা যাক, যিনি উচ্ছেদের ভয়ে প্রতিনিয়ত বাস করেন, যাঁর ঘর যে কোনও দিন ভেঙে দেওয়া হতে পারে। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিরাপদে রাখার বাস্তব সুযোগ কোথায়? প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, কাজের অনিশ্চয়তা—এই সবই তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। অথচ SIR-এর কঠোর শর্তে এই মানুষগুলোর নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারই যেন সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। ভোটাধিকার আর জন্মগত বা সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং কাগজপত্র দেখিয়ে নিজেকে ‘যোগ্য’ প্রমাণ করার এক অন্তহীন লড়াইয়ে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ার আরেকটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক দিক হলো তার স্বচ্ছতার অভাব। কে বাদ পড়বে, কোন যুক্তিতে বাদ পড়বে, কীভাবে বাদ দেওয়া হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সাধারণ নাগরিকের কাছে স্পষ্ট নয়। সংশোধনের সুযোগ কতটা সহজ? আপিলের পথ কতটা কার্যকর? প্রশাসনিক ভুল হলে তার দায় নেবে কে? এই প্রশ্নগুলোর কোনও পরিষ্কার ও সহজবোধ্য ব্যাখ্যা এখনও সাধারণ মানুষের সামনে আসেনি। প্রশাসনিক ভাষার জটিলতা, প্রযুক্তিগত পরিভাষা ও দীর্ঘ ফর্মের আড়ালে সাধারণ মানুষ প্রায়ই নিজের অধিকার বুঝতেই হিমশিম খায়। ডিজিটাল বিভাজনের যুগে প্রযুক্তি যে সবার জন্য সমান নয়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন কিংবা ডিজিটাল জ্ঞান—সব নাগরিকের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। অথচ SIR-এর মতো প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সেই বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো আস্থা—নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস। কিন্তু যখন নাগরিককে বারবার নিজের অধিকার প্রমাণ করতে হয়, তখন সেই আস্থা ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে অংশীদার না ভেবে সন্দেহভাজন হিসেবে দেখতে শুরু করে, তবে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মানে শুধু একটি অধিকার হরণ করা নয়; এটি নাগরিককে রাষ্ট্রের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। যে মানুষটি ভোট দিতে পারে না, সে ধীরে ধীরে নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়ের আলোচনার বাইরে চলে যায়।

আরও একটি গুরুতর আশঙ্কা হলো—এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রশাসনিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। ভোটার তালিকা নিছক একটি নামের তালিকা নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার মানচিত্র। এই মানচিত্রে যদি ইচ্ছাকৃত বা পক্ষপাতদুষ্ট কাটাছেঁড়া হয়, তার প্রভাব পড়ে নির্বাচনের ফলাফলে, সরকার গঠনে এবং শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণের গতিপথে। গণতন্ত্রে নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের মাধ্যম নয়; এটি জনগণের মতামতের প্রতিফলন। সেই প্রতিফলন যদি বিকৃত হয়, তবে পুরো ব্যবস্থাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই SIR কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়—এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

ইতিহাস আমাদের বারবার শিক্ষা দিয়েছে—যেখানে ভোটাধিকার সংকুচিত হয়েছে, সেখানেই স্বৈরশাসনের বীজ রোপিত হয়েছে। বিশ্বের বহু দেশে গণতন্ত্র ধ্বংস হয়েছে ধাপে ধাপে, হঠাৎ করে নয়। প্রথমে কিছু মানুষের ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তারপর আরও কিছু মানুষের। এক সময় দেখা গেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নীরব দর্শকে পরিণত হয়েছে। আজ যদি নীরবে SIR মেনে নেওয়া হয়, কাল হয়তো আরও কোনও ‘বিশেষ’ সংশোধনের নামে আরও অধিকার খর্ব হবে। আজ ভোটার তালিকা, কাল নাগরিকত্ব—এই ঢালু পথে নামা মানে গণতন্ত্রকে ধীরে ধীরে আত্মসমর্পণ করানো।

প্রতিবাদ মানে শুধু স্লোগান তোলা নয়; প্রতিবাদ মানে প্রশ্ন করা, যুক্তি তুলে ধরা এবং নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা। আমি প্রশ্ন তুলছি—ভোটার তালিকা শুদ্ধ করতে হলে কেন বারবার দরিদ্র ও দুর্বল মানুষদেরই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে? কেন প্রযুক্তির সুবিধা সবার জন্য সমানভাবে ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যবহার করা হচ্ছে না? কেন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সহানুভূতি এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে নেই? কেন নাগরিককে রাষ্ট্রের সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে, অংশীদার হিসেবে নয়?

এই লেখা কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়—এটি গণতন্ত্রের পক্ষে। কারণ গণতন্ত্র বাঁচে তখনই, যখন শেষ মানুষটির ভোটাধিকারও নিরাপদ থাকে। Special Intensive Revision যদি সত্যিই গণতন্ত্রের স্বার্থে হয়, তবে তাকে হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক। নচেৎ ইতিহাস একদিন নির্মমভাবে প্রশ্ন করবে—আমরা তখন কোথায় ছিলাম, যখন ভোটাধিকারকে ‘বিশেষ সংশোধন’-এর নামে ধীরে ধীরে খর্ব করা হচ্ছিল?


Exit mobile version