বিরোধী আসন থেকে সরকারে। জার্নিটা খুব সহজ ছিল না। এই উত্থানের লড়াই ছিল প্রতি বিন্দুতে। আজ সেই লড়াইয়ের বৃত্ত পূর্ণ হলো। পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari Profile)।
১৯৭০ সালে কাঁথির একটি রাজনৈতক পরিবারে জন্ম নেন শুভেন্দু। বাবা শিশির অধিকারী বর্ষীয়ান রাজনীতিক৷ প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবেই ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির পাঠ তাঁর রক্তে মিশে ছিল। রামকৃষ্ণ মিশনে পড়াশোনা। আটের দশকের শেষ পর্বে কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি শুভেন্দুর। কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের হয়ে শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু।
১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভা ভোটে কংগ্রেসের টিকিটে জিতে কাউন্সিলর হন শুভেন্দু অধিকারী। ২০০১ সালে মুগবেড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্রে শুভেন্দুকে প্রার্থী করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু, তিনি তৎকালীন মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দের কাছে হেরে যান।
তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার কেমিক্যাল হাব তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়৷ গড়ে ওঠে তীব্র গণআন্দোলন৷ মমতা এবং বাকিদের সঙ্গে আন্দোলনের পুরভাগে ছিলেন শুভেন্দু। ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’-র ছাতার তলায় সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। পুলিশের গুলি, লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় তাঁর সেই আপসহীন ভূমিকা তাঁকে রাতারাতি রাজ্য রাজনীতির এক অন্যতম হেভিওয়েট নেতায় পরিণত করেছিল। নন্দীগ্রামের সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে তমলুক কেন্দ্রে সিপিএম লক্ষ্মণ শেঠের কাছে পরাজিত হন শুভেন্দু। ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে প্রথমবার জিতে বিধায়ক হন শুভেন্দু অধিকারী। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন শুভেন্দুর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠে অধিকারী পরিবারের মেজ ছেলে। গোটা রাজ্য তাঁর নাম জানতে শুরু করে।
২০০৯ এবং ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তমলুক কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। শুধু মেদিনীপুর নয়, জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদ, মালদা-রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অনস্বীকার্য। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে জিতে রাজ্যের পরিবহণ, পরিবেশ, সেচ ও জলসম্পদ উন্নয়ন দফতরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরের মন্ত্রী হন৷
বছর চারেক বাদে শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবনে আসে এক বিশেষ বাঁক৷ সরকার পরিচালনা থেকে শুরু করে সংগঠনে নেতৃত্বের প্রশ্নে তাঁর সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে তৃণমূলের৷ কয়েক মাস সেভাবেই কাটে৷ ততদিনে রাজ্য রাজনীতিতে শুভেন্দুকে নিয়ে জোর তরজা, শেষমেশ ২১ বছর ধরে করে আসা দলের হাত ছেড়ে বিজেপির সদস্য হন৷ ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে মেদিনীপুরের সভায় তাঁর হাতে পতকা তুলে দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ৷
২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যয়কে পরাজিত করেন তিনি। বসেন বিরোধী দলনেতার আসনে। পাঁচ বছর পর ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ফের পরাজিত করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে, এবার ভবানীপুর থেকে। আরেক আসনে নন্দীগ্রামেও জেতেন বিপুল ভোটে। এরপরে তাঁকে বঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে রাখছিলেন অনেকে। শুক্রবার কলকাতা বিমানবন্দরের একটা ছবিই সবকিছু স্পষ্ট করে দিয়েছিল। শুভেনদু অধিকারীর পিঠে হাত দিয়ে একেবারে ক্যামেরায় পোজ দিতে দেখা যায় অমিত শাহকে।
এবার রাজনীতির সেই বৃত্তের শেষে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের মাঠে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শনিবার শপথ নিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের শুভেন্দু অধিকারী।

