কলকাতার হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাল রঙের সেই ঐতিহাসিক ভবন রাইটার্স বিল্ডিং (Writers’ Building)। কেউ বলেন মহাকরণ, কেউ বলেন লালবাড়ি। ব্রিটিশ আমল থেকে বাংলার প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠা এই ভবন আবারও ফিরতে চলেছে রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দুতে। পালাবদলের বাংলায় এবার বিজেপি সরকারের হাত ধরে ফের ক্ষমতার আলো জ্বলছে রাইটার্সে।
১৭৮০ সালে স্থপতি টমাস লিয়নের নকশায় তৈরি হয়েছিল এই ভবন (Writers’ Building)। মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরুণ ‘রাইটার’ বা কেরানিদের থাকার জায়গা হিসাবেই গড়ে উঠেছিল রাইটার্স বিল্ডিং। সেই থেকেই নাম ‘রাইটার্স’। পরে ধীরে ধীরে এই ভবনই হয়ে ওঠে বাংলার প্রশাসনিক স্নায়ুকেন্দ্র। লালদিঘির উত্তর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রেকো-রোমান ও নব্য-রেনেসাঁ শৈলীর এই ভবন কলকাতার প্রথম তিনতলা বাড়িগুলির অন্যতম।
স্বাধীনতার পরে এই রাইটার্স বিল্ডিংই (Writers’ Building) হয়ে ওঠে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধান সচিবালয়। বহু মুখ্যমন্ত্রী, বহু রাজনৈতিক পালাবদল, অসংখ্য ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সাক্ষী থেকেছে লালবাড়ি। জ্যোতি বসু থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— সকলেই এই ভবনের ঘর থেকেই দীর্ঘদিন বাংলা শাসন করেছেন। শুধু প্রশাসন নয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসেও রক্তমাখা অধ্যায় রয়েছে এই ভবনের সঙ্গে। ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বিপ্লবী বিনয়, বাদল ও দীনেশ এই ভবনে ঢুকে ব্রিটিশ অফিসার কর্নেল সিম্পসনকে হত্যা করেছিলেন। ইতিহাসে যা ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়সের ভাড়ে জীর্ণ হতে শুরু করে মহাকরণ। বাম আমলের শেষ দিকে ভবনের বিভিন্ন অংশে সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়। পরে ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে রাইটার্স (Writers’ Building) থেকেই প্রশাসন চালালেও ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর সচিবালয় সরিয়ে নিয়ে যান হাওড়ার নবান্নে। তখন বলা হয়েছিল, সংস্কার শেষ হলেই ফের প্রশাসন ফিরবে লালবাড়িতে। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই কাজ সম্পূর্ণ হয়নি।
শপথ মঞ্চে ৯৭ বছরের বৃদ্ধের পায়ে হাত মোদীর, কে তিনি ?: Writers’ Building: লালবাড়িতে ফের ক্ষমতার আলো! রাইটার্সে বসলো মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেমপ্লেটএবার রাজনৈতিক পালাবদলের পর ফের আলোচনার কেন্দ্রে রাইটার্স বিল্ডিং। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল— বাংলার প্রশাসন আবার ফিরবে ঐতিহ্যবাহী মহাকরণে (Writers’ Building)। সেই প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন দেখা গেল শুক্রবার রাতে। গেরুয়া আলোর মালায় সেজে উঠল গোটা রাইটার্স বিল্ডিং। শুধু মহাকরণ নয়, মধ্য কলকাতার একাধিক সরকারি ভবনও গেরুয়া আলোয় আলোকিত করা হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটা শুধু আলোকসজ্জা নয় বরং ক্ষমতার নতুন প্রতীকের প্রকাশ।
ইতিমধ্যেই রাইটার্স বিল্ডিংয়ে (Writers’ Building) মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নামে নতুন নেমপ্লেট বসানো হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, মহাকরণের ভিভিআইপি ব্লকের তিনতলায় নতুন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য ঘর তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। মার্বেল বসানো থেকে ইন্টেরিয়র ডেকরেশন — অত্যন্ত তৎপরতায় চলছে প্রস্তুতি। পূর্ত দফতরের ইঞ্জিনিয়াররা ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ ঘর চিহ্নিত করে সংস্কারের কাজ করছেন।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি অনুকূলে নয়। মহাকরণের বহু অংশ এখনও সংস্কারাধীন। ঐতিহাসিক রোটান্ডা, পুরনো ক্যাবিনেট রুমসহ বেশ কিছু এলাকা এখনও ভগ্নপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। সেই কারণে নতুন সরকার আপাতত পুরোপুরি রাইটার্স থেকে কাজ শুরু করতে পারছে না।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শপথের পরে রাইটার্সে যেতে পারেন ঠিকই কিন্তু প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠক হবে নবান্নেই। অর্থাৎ আপাতত ‘নীলবাড়ি’ থেকেই শুরু হবে নতুন সরকারের প্রশাসনিক যাত্রা। পাশাপাশি বিধানসভা ভবন ও তার অ্যানেক্স বিল্ডিংয়েও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দফতরের অস্থায়ী ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তবু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, এটা শুধুই সময়ের অপেক্ষা। এক দশকের বেশি সময় পরে আবার বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে ফিরতে চলেছে লালবাড়ি। ইতিহাস, আবেগ, রাজনীতি ও প্রশাসনের মিশেলে রাইটার্স বিল্ডিং আবারও হয়ে উঠছে বাংলার নতুন ক্ষমতার প্রতীক।
ঝালমুড়িতে ‘ঝাল’ বার্তা! ব্রিগেডে উৎসবের মেজাজে বিজেপি কর্মীরা: Writers’ Building: লালবাড়িতে ফের ক্ষমতার আলো! রাইটার্সে বসলো মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেমপ্লেট
