বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তক্ষশীলার (Taxila) সংরক্ষণে গুরুতর গাফিলতির অভিযোগে পাকিস্তানকে কড়া সতর্কবার্তা দিল ইউনেস্কো (UNESCO)। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির অভিযোগ, সংরক্ষণের নামে আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে এমনভাবে সংস্কারের কাজ করা হয়েছে, যা প্রাচীন স্থাপত্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দ্রুত এই পরিবর্তন ফিরিয়ে না আনলে তক্ষশীলাকে ‘বিপন্ন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ এর তালিকাভুক্ত করা হতে পারে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদাও হারাতে পারে এই ঐতিহাসিক স্থানটি।
ইউনেস্কোর আপত্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তক্ষশীলা প্রত্নক্ষেত্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ— মোহরা মোরাদু এবং সিরকাপ। অভিযোগ, সংরক্ষণের নামে বহু প্রাচীন পাথরের দেওয়ালের অংশ ভেঙে সেখানে নতুন ইট-পাথর ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও আবার পুরনো কাঠামোর উচ্চতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আধুনিক নির্মাণশৈলী ব্যবহার করায় ঐতিহাসিক নিদর্শনের আসল রূপ এবং প্রত্নমূল্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছে ইউনেস্কো।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের মার্চ মাসে এক দর্শনার্থী সংস্কারের বিভিন্ন ছবি ও তথ্য প্যারিসে পাকিস্তানের ইউনেস্কো প্রতিনিধির কাছে পাঠান। সেই ছবিতে দেখা যায়, প্রাচীন দেয়ালের জায়গায় নতুন গাঁথনি তৈরি করা হয়েছে এবং আধুনিক উপকরণ দিয়ে নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে। এরপরই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। সম্প্রতি ইউনেস্কো, পাকিস্তানের প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগ এবং জাতীয় ঐতিহ্য মন্ত্রকের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে তক্ষশীলা পরিদর্শন করেন। পরে সংস্কার সংক্রান্ত সমস্ত নথি ও বিস্তারিত তথ্য পাকিস্তানের কাছে চেয়ে পাঠায় ইউনেস্কো। (Taxila Pakistan)
ইউনেস্কোর বক্তব্য, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সংরক্ষণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা কঠোরভাবে মানা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে সিমেন্ট বা আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে প্রাচীন কাঠামো পুনর্নির্মাণ সংরক্ষণ নীতির পরিপন্থী। এমন কাজ ঐতিহাসিক স্থাপনার আসল গুরুত্ব এবং অখণ্ডতা নষ্ট করে। তাই অবিলম্বে এই পরিবর্তনগুলি প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি। অন্যথায় তক্ষশীলাকে প্রথমে ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’ তালিকায় এবং প্রয়োজনে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকেই বাদ দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। অতীতেও একই ধরনের কারণে জার্মানির একটি বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নজির টেনে পাকিস্তানকে সতর্ক করেছে ইউনেস্কো।
তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। তাদের দাবি, কোনও পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। দীর্ঘদিনের ক্ষয়ে যাওয়া ও ভেঙে পড়ার মুখে থাকা স্থাপনাগুলিকে রক্ষা করতেই সীমিত পরিসরে সংরক্ষণমূলক কাজ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহাসিক কাঠামোকে আরও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো, নতুন নির্মাণ করা নয়। (Taxila Pakistan)
খামেনেইর শেষযাত্রা ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা, বাবার অন্ত্যেষ্টিতেও থাকছেন না মোজতবা
বর্তমান পাকিস্তানের রওয়ালপিন্ডিতে পাঞ্জাব প্রদেশে অবস্থিত তক্ষশীলা একসময় প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রধান জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে মৌর্য, ইন্দো-গ্রিকসহ একাধিক সভ্যতার ইতিহাস বহন করে এই অঞ্চল। এখানে রয়েছে বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ, শিক্ষাকেন্দ্র এবং প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। এই স্থানের অসামান্য ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৮০ সালে ইউনেস্কো তক্ষশীলাকে বিশ্ব ঐতিহ্যস্থলের বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের মর্যাদা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তক্ষশীলাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থানের সংরক্ষণের প্রশ্ন নয় বরং পাকিস্তানের সামগ্রিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার উপরও বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্দেশ কত দ্রুত পালন করে পাকিস্তান, এখন সেদিকেই নজর বিশ্ব ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞদের। (Taxila Pakistan)

