তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের ক্ষমতার লড়াই শুক্রবার আরও নাটকীয় মোড় নিল। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকার দলের সাংগঠনিক সদর দফতরের দখল নেয়। একদিন আগেই নির্বাচন কমিশনের কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম, প্রতীক এবং সংগঠনের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করে আবেদন জানিয়েছিল এই শিবির। সেই আবেদনের পরের দিনই দলের সদর দফতরে প্রবেশ করে বৈঠক করার ঘটনাকে রাজনৈতিক মহল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে। বিদ্রোহী নেতাদের দাবি, এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে চায় যে তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস এবং সংগঠনের ধারাবাহিকতার অধিকারী। (Ritabrata Banerjee TMC Headquarters)
শুক্রবার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দলের সদর দফতরে উপস্থিত ছিলেন ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, আখরুজ্জামান-সহ একাধিক শীর্ষ নেতা। সেখানে দীর্ঘ বৈঠকের পর বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এখন থেকে এই অফিস থেকেই দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তাদের দাবি, অফিসের মালিকদের সঙ্গে সমস্ত প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং আইন মেনেই তারা এই দফতরের দায়িত্বগ্রহণ করেছেন। আখরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরাই তৃণমূল কংগ্রেস। এই অফিসের সঙ্গে দলের কর্মী-সমর্থকদের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। তাই এই অফিস থেকেই আমাদের সাংগঠনিক কাজ চলবে।” ঘটনার পর কার্যালয়ের মূল ফটকে ঝোলানো হয় নতুন পোস্টার, যেখানে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও ছবি রাখা হয়নি। পরিবর্তে পোস্টারে স্পষ্টভাবে চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অরূপ রায়ের নাম। পাশাপাশি কার্যালয়ের গেটে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় নতুন তালাও। (Ritabrata Banerjee TMC Headquarters)
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ইএম বাইপাসের পুরনো তৃণমূল ভবন পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকার এই ভাড়া করা অফিস থেকেই দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। সেই কারণেই এই অফিসকে ঘিরে দলীয় পরিচয় ও সাংগঠনিক বৈধতার একটি বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দফতরের দখল নেওয়া শুধুমাত্র একটি অফিসে প্রবেশের ঘটনা নয়, বরং সংগঠনের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতীকী পদক্ষেপ। (Ritabrata Banerjee TMC Headquarters)
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত শিবিরের সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পর থেকেই নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে মতবিরোধ শুরু হয়। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, দলের অধিকাংশ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন। গত মাসে বিদ্রোহী শিবিরের ডাকা বিশেষ বৈঠকে প্রবীণ বিধায়ক অরূপ রায়কে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করা হয়। সেই বৈঠকে গৃহীত একাধিক সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই তারা নিজেদের বৈধ নেতৃত্ব বলে দাবি করছে। (Ritabrata Banerjee TMC Headquarters)
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির এই সমস্ত দাবি সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, বিদ্রোহী শিবিরের বৈঠক ও সিদ্ধান্ত দলীয় সংবিধান মেনে হয়নি। পাশাপাশি তারা দাবি করেছে, দল থেকে বহিষ্কৃত বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করার কোনও সাংগঠনিক বা আইনগত অধিকার নেই। ফলে বিদ্রোহী শিবিরের সমস্ত পদক্ষেপই অসাংবিধানিক। (Ritabrata Banerjee TMC Headquarters)
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে যান ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল। তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে দলের সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্ব, অনুমোদিত প্রতিনিধিত্ব, দলীয় নাম এবং প্রতীকের উপর নিজেদের দাবি তুলে ধরে। বৈঠকে বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সাংগঠনিক নথি ও যুক্তিও কমিশনের সামনে পেশ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।(Ritabrata Banerjee TMC Headquarters)
এরপর নির্বাচন কমিশন বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে দুই পক্ষকেই নোটিস পাঠায়। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের দুই গোষ্ঠীকে সাংগঠনিক নির্বাচন, অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী, দলীয় নেতৃত্ব এবং সংগঠনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সমস্ত দাবি ও পাল্টা দাবি আগামী ৬ জুলাই বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের মধ্যে লিখিতভাবে জমা দিতে হবে। এরপর কমিশন উভয় পক্ষের বক্তব্য, নথি এবং আইনি যুক্তি খতিয়ে দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এখন তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিরোধ শুধুমাত্র রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিষয়টি সাংগঠনিক, আইনি এবং নির্বাচনী—তিনটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে। একদিকে দলের সদর দফতরের দখল নিয়ে প্রতীকী শক্তি প্রদর্শন, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের সামনে নাম ও প্রতীকের দাবি—সব মিলিয়ে আগামী কয়েকদিন এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং দুই পক্ষের জমা দেওয়া নথির উপর। (Ritabrata Banerjee TMC Headquarters)
আরও পড়ুন :- মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর প্রশংসা, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রতকে নিশানা কুণালের









