কুশল চক্রবর্তী
এই মুহূর্তে সংবাদমাধ্যমে খবরটা নিয়ে খুব হই চই হচ্ছে। ঘটনা যে হৃদয় বিদারক তাতে কোনও দ্বিরুক্তি নেই (Jitu Munda Anil Ambani)। যে ভাবে ওডিশার একজন আদিবাসী মানুষ জিতু মুন্ডা তাঁর স্বর্গীয় বোন কাঁকড়া মুন্ডার অ্যাকাউন্টের মাত্র ১৯৩০০ টাকা তুলতে তাঁকে কবর থেকে তুলে কাঁধে করে ওডিশার কেওনঝাড় জেলার ওডিশা গ্রামীণ বিকাশ ব্যাঙ্কের মালিপসি শাখায় হাজির হয়েছিলেন এটা সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না।
ওই ব্যাঙ্কের আধিকারিকরা তাঁকে বার বার ফিরিয়ে দিয়েছিল মৃত বোনের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে চাইলে। বার বার জিতু মুন্ডা তাঁর বোনের মৃত্যুর কথা বললেও ব্যাঙ্কের আধিকারিকরা তা বিশ্বাস করেননি। তাঁর কাছে চেয়েছিলেন বোনের মৃত্যুর শংসাপত্র। এটাই ব্যাঙ্কের সাধারণ নিয়ম। তবু এটা ঠিক, এই জিতু মুন্ডা নাকি আগে একাধিকবার ব্যাঙ্কে এসেছিল তাঁর বোনকে নিয়ে, অতএব ব্যাঙ্কের আধিকারিকের উচিত ছিল তাঁর সঙ্গে আরও ভালোভাবে সহানুভুতি সহকারে কথা বলে বিষয়টা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ব্যাঙ্ক বা সরকারের আধিকারিকরা এখন সব দোষটা ওই ব্যাঙ্কের শাখার লোকেদের চাপিয়ে দিতে চাইছে। হয়তো সংবাদমাধ্যমে এত কথা লেখালেখির ফলে জিতু মুন্ডার কপালে ওই টাকাটার চেয়েও বেশী টাকা জুটেও গিয়েছে। আবার এটাও বলা যেতেই পারে যে, ব্যাঙ্কের সংশ্লিষ্ট আধিকারিক বা অন্য সদস্যদের যে দোষ নেই তাও নয়, তাদের কিছু শাস্তিও হয়তো প্রাপ্য, কিন্তু সমগ্র ব্যাপারটা দেখলেই বুঝতে পারবেন “কাঁঠালের আমসত্ত্ব” হয় না।
ভারতের অর্থনীতি নেমে গেল বিশ্বের ছয় নম্বরে, কেন এই পতন?
ব্যাঙ্কিং শিল্পে মানবিকতার অভাব
ব্যাঙ্কে বহুদিন কাজ করা এক আধিকারিকের কথায়, “ব্যাঙ্কিং শিল্পে যত মেশিন বসেছে তত গ্রাহক আর ব্যাঙ্কের লোকদের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ কমছে। আগের দিনে প্রতি ব্যাঙ্কের শাখায় এমন কিছু পুরনো কর্মচারী থাকতেন যারা কি না গ্রাহকের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতেন, এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাঁরা হয়ে উঠতেন গ্রাহকের পরিবারের এক জন মানুষ। কিন্তু ২০০৫ সালের কাছাকছি সময় থেকে ব্যাঙ্কের পরিচালকরা ইউনিয়নের আধিপত্য খর্ব করার জন্য ব্যাঙ্কগুলোর বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারীদের যে বদলি নীতি চালু করল তাতে কোনও ব্যাঙ্কের কোনও শাখাতেই পুরনো লোক, যারা কি না গ্রাহকের সুখ সুবিধার খবর রাখত, তাদের পাওয়াই মুশকিল হয়ে গেল।
আর এখন তো বেশীর ভাগ শাখাতেই, ব্যাঙ্ক বলেই দিচ্ছে যে ব্যাঙ্কের শাখাভিত্তিক পরিষেবার ধারনাটাই অচল। ব্যাঙ্কের একজন প্রাক্তন আধিকারিক ব্যাঙ্কের স্বপক্ষেই কথা বলবেন এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা বাদ দিলেও, আজকের ব্যাঙ্কগুলো যে ভাবে চলেছে তাতে বাস্তবে গ্রাহকের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা কতটা সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পার। একে তো শাখা পর্যায়ে লোকের অভাব, তায় আবার ব্যাঙ্কের আভ্যন্তরীণ আদেশ অনুসারে নিত্য নতুন নিয়ম চালুর প্রয়াসে গ্রাহকের প্রতি নজর দেওয়ার সময় থাকছে না।
কর্মী নিয়োগ বনাম অবসর: অশ্বত্থামা হত ইতি গজ
কয়েকদিন আগে ভারত সরকারের অর্থমন্ত্রক ঘোষণা করেছে যে, গত অর্থবর্ষে তাঁরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোতে ৫০৫৫২ লোক নিয়োগ করেছে, যা কি না ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের চেয়ে ৩৩% বেশী। একথাও বলেছে যে ২০১৯-২০ সাল থেকে ২০২৪-২৫ অবধি তারা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোতে ১ লক্ষ ৫০ হাজারের বেশি লোক নিয়োগ করেছে। কিন্তু একবারও বলেনি যে এই পাঁচ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে কত লোক অবসর নিয়েছে। একটা সামান্য পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, এটা হচ্ছে “অশ্বথমা হত ইতি গজ”। ব্যাঙ্ক অফ বরোদার কর্মীসংখ্যা ২০২৩-২৪ বর্ষে ছিল ৭৪২২৭। সরকার বাহাদুর গর্ব করে অনেক লোক নিয়োগের দাবি করার পর দেখা গেল ২০২৪-২৫ এসে তাদের কর্মী সংখ্যা কমে এসেছে ৭৩৭৪২ তে। বুঝতেই পারছেন যত লোক ব্যাঙ্কে নেওয়া হলো, তার চেয়ে অনেক বেশি লোক ব্যাঙ্ক থেকে অবসর নিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ কি না ব্যাঙ্কের শাখায় লোকের অভাব থেকেই গেল। এরকম অবস্থা বলতে গেলে সব ব্যাঙ্কেরই। তায় আবার দেখা যাচ্ছে প্রায় সব ব্যাঙ্কেই আধিকারিকদের সংখ্যা করনিকদের চেয়ে এখন বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ কি না কোনও শাখায় বেশিদিন থাকা লোকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অতএব সেই থোড় বড়ি খাঁড়া আর খাঁড়া বড়ি থোড়।
সমন্বয়ের অভাব, 15G আর 15H-এর পরিবর্তিত রূপে মুশকিলে গ্রাহকরা
এছাড়াও আছে ব্যাঙ্কের ব্যবসা বাড়ার ব্যাপার। উল্লিখিত, এই পাঁচ বছরে ব্যাঙ্কের ব্যবসা বেড়েছে বছর প্রতি ১১% হারে। অতএব বুঝতেই পারছেন কী পরিমাণ কাজের চাপ বেড়েছে কর্মচারীদের। গ্রাহকের প্রতি ব্যাঙ্কের কর্মচারীদের সঠিক সময় দেওয়ার উপায় কোথায়? যদি বা কিছু সময় দেওয়াও হয় গ্রাহকদের, তা তো সেই মিউচুয়াল ফাণ্ড বা নানা রকম ইনসিওরেন্স করতে আসা “হাই নেট ওর্থ” বা অর্থের বলে বলীয়ান মানুষদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে দেখুন মাত্র ১৯৩০০ টাকার জন্য একটি ব্যাঙ্কের কাছে একজন গরীব আদিবাসী মানুষকে এতটা হেনস্থা হতে হল। কিন্তু ভারতের অন্যতম বিখ্যাত ব্যবসায়ী অনিল আম্বানি ৫৩টি ব্যাঙ্কের কাছে থেকে ৪৭২৫৭ কোটি টাকা ধার নিয়ে ফেরত না দিতে পেরে শুধু প্রশ্ন উত্তরের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছেন।
আজ এরকম একটা অত্যন্ত অমানবিক ঘটনার পর নানা কথা উঠে আসছে, কিন্তু যে কথা কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাঙ্কিং দপ্তর বা ব্যাঙ্কের উচ্চপদে আসীন আধিকারিকরা বলছে না, তা হলো ব্যাঙ্কিং শিল্পে মুনাফা থাকবে কিন্তু তা যেন গ্রহকের চোখের জলের বিনিময়ে না আসে।

