কুশল চক্রবর্তী
বিগত বছরগুলোতে ভারতে ডিজিটাল লেনদেন যে বেড়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই (Polymer Notes in India)। কিন্তু তার ফলে টাকার চাহিদায় কিন্তু একটুকুও খামতি হয়নি। ভারতীয় ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার কর্ণধার রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে টাকার চাহিদা বেড়েছে গতবারের তুলনায় ১১.৯%। বাজারে লেনদেন যোগ্য টাকার মূল্যের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৪১.২ লক্ষ কোটি টাকায়। এমনকি চাহিদার সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে ১৭.১ লাখ বিভিন্ন টাকার নোট বাজারে ছাড়তে হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাঙ্ক ব্যবস্থায় জাল নোট ধরতে তৎপর হওয়ার পরও দেখা গিয়েছে জাল নোটের সংখ্যা বেড়েছে।
অধিক নোট ছাপানোর প্রয়োজনীয়তার দিকে তাকিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ধরনের নোট বাজারে আনার কথা বলছে। মূলত দেখা গিয়েছে যে ৫০ টাকা, ২০ টাকা আর ১০ টাকার কাগজের নোটগুলো অতি তাড়াতাড়ি বাজারে অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়ছে। আর বার বার নোট ছাপানোর ফলে, এই কাজের খরচ বেড়েই যাচ্ছে। তাই এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ভাবছে কিছু প্লাস্টিকের বা পলিমার মিশ্রিত নোট তৈরির কথা। এই রকম নোটগুলো নাকি তাদের রূপ ও রং অনেকদিন বেশি ধরে রাখতে পারে।
সরকার বাহাদুরের অনুমতিক্রমে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বাজার থেকে ২০০০ টাকার নোট তুলে নেওয়ার পর থেকে এখন ভারতের বাজারের প্রায় ৮৫% লেনদেন চলে ৫০০ টাকার নোটের মাধ্যমে। দিনের দিন তাই ৫০০ টাকার নোটের চাহিদা বেড়েছে। আর ছোট নোট মানে ১০ টাকা আর ২০ টাকার নোটের অভাব নিয়ে আসুমুদ্র হিমাচল বিতর্ক তো লেগেই রয়েছে। এই যে টাকার এই চাহিদা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও বাবসা বাণিজ্যে বা মানুষের মূল লেনদেন হিসাবে তা এখনও জায়গা করে নিতে পারেনি। অন্য দিকে নকল নোট গত বছরে ২২৯৭৪৬টা ধরা পরেছে। তার আগের বছরে এর পরিমাণ ছিল ২১৭৩৯৬টা। এটা বোঝা গিয়েছে ব্যাঙ্কগুলো নকল নোট ধরার পরিমাণ বাড়ালেও তার যোগান খুব একটা কমেনি।
ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক শুধু নতুন নোট ছাপানো নিয়েই মুশকিলে পড়েনি, মুশকিলে পড়েছে পুরনো নোট বাজার থেকে সরিয়ে ফেলা নিয়েও। ১০ টাকা, ২০ টাকা আর ৫০ টাকার নোটগুলো দ্রুত বাজারে চলার অযোগ্য অবস্থায় চলে আসার জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে অনেক খরচা করে তাদের বাজার থেকে সরিয়ে ফেলতে হচ্ছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া নতুন নোট বাজারে আনার জন্য খরচা করেছে ৪৮৭৫.২ কোটি টাকা, হয়তো তা ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের খরচ ৬৩৭২.৮ কোটি টাকার থেকে কম। কিন্তু তাতে তাঁরা ২০০০০ সংখ্যার মত কম নোটও বানিয়েছিল। এটা অবশ্য ঠিক, বিগত দু’বছরে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া উন্নত মানের নোট বানানোর দিকেও নজর দিয়েছে।
এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এর মুল চিন্তা হচ্ছে এই যে তারা পলিমার মিশ্রিত বিভিন্ন টাকার নোট বাজারে আনতে চলছে, তার স্থায়িত্ব কতদিন হবে? এই যে বাজারে ছোট নোটের এত অভাব বা সেই অর্থে অর্থনীতিতে এখনও এত বেশী নগদের লেনদেন, তা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে যে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর, বিমুদ্রাকরনের সময় বলা হয়েছিল এর ফলে বাজারে নগদের লেনদেন কমবে, নকল নোট বাজার থেকে উধাও হয়ে যাবে বা কালো টাকার অবস্থাটাও পাল্টাবে তা কতটা ঠিক?
বিমুদ্রাকরনের সময়ে ১৫.৪৪ লক্ষ কোটি টাকা মূল্যের নোট বাজারে চালু ছিল, এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪১.২ লক্ষ কোটি টাকায়, আর নকল নোটের পরিমাণ কিছুটা কমলেও তা বাজার থেকে অবশ্যই একবারে উধাও হয়নি। অন্যদিকে কতিপয় বিদেশী সংস্থা আর স্বনিযুক্ত সংস্থা এখনও মনে করছে ভারতে এখনও জিডিপির ১০% থেকে ২০% কালো টাকা চলাচল করে। তাই আজও ভাবতে হয় বিমুদ্রাকরনের সাফল্য কতখানি?

