জীবনে কে কোথা থেকে শুরু করবে, আর কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। যদি নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সাহস থাকে, তাহলে যে কোনও সাধারণ মানুষও অসাধারণ সাফল্যের গল্প লিখতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার চাকদহের সূর্য বিশ্বাসের জীবন সেই গল্পেরই এক বাস্তব রূপ।
মাত্র ২৮ বছর বয়সে সূর্য এখন দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও। শুধু তাই নয়, AI নিয়ে ইতিমধ্যে তাঁর দুটি গবেষণাপত্রও প্রকাশিত হয়েছে। অথচ কয়েক বছর আগেও পেট চালাতে Zomato র ডেলিভারি পার্টনার হিসেবে কাজ করতেন। প্রতিদিন তাঁর আয় ছিল প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। (Suraj Biswas)
সূর্যের জন্ম ও বড় হওয়া নদিয়ার চাকদহে। স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতাদের যে ধরনের পারিবারিক বা সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে বলে অনেকেই মনে করেন, তাঁর জীবন একেবারেই তেমন ছিল না। কলকাতার গুরু নানক ইনস্টিটিউট অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে জেনেটিক্সে গ্র্যাজুয়েট হন। ছোটবেলা থেকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু জীবন তাঁকে নিয়ে গিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে।
গ্রাজুয়েশনের পরেই নিজের হাত খরচা চালাতে এবং পরিবারের পাশে দাঁড়াতে Zomato-তে ডেলিভারি পার্টনার হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা ইনকাম করতেন তিনি। তবে এখন সেই দিনগুলোর কথা ভেবে মোটেই লজ্জা পান না সূর্য, বরং ওই সময়টাই তাঁর কাছে গর্বের।
রোজ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে খাবার পৌঁছে দিতে দিতে তাঁর মাথায় অন্য এক চিন্তা ঘুরপাক খেতে শুরু করে। তিনি লক্ষ্য করেন, আমাদের দেশে প্রত্যেকটি বাচ্চার শেখার ক্ষমতা আলাদা হলেও শিক্ষা ব্যবস্থা সবাইকে একইভাবে শেখানোর চেষ্টা করে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, অনেক ছাত্র মেধার অভাবে নয়, বরং সঠিকভাবে শেখানোর অভাবেই পিছিয়ে পড়ে। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর প্রথম স্টার্টআপ Assessli-র ধারণা। (Suraj Biswas)
এরপর তাঁর ভাবনা আরও বড় হয়ে ওঠে। তিনি প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, এত উন্নত AI প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন তা একজন মানুষকে আলাদা করে বুঝতে পারে না? কেন সব AI কেবল মানুষের একটি বড় দলের আচরণের ধরণ শিখে, কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট মানুষের মানসিক অবস্থা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা ব্যক্তিগত কারণগুলো বোঝে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি নিজেই সমাধান তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।
২০২১ সালে কোনও ইনভেস্টার, স্থায়ী অফিস বা সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছাড়াই তিনি Assessli শুরু করেন। পরে তিনি আরও একটি AI সংস্থা Dots-in গড়ে তোলেন। বর্তমানে এই দুই সংস্থারই প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও তিনি নিজেই।তবে এই পথটা মোটেও সহজ ছিল না। সূর্যের কথায়, সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা। ছোট শহরের ছেলে, অচেনা কলেজের ছাত্র, আর পেশায় একসময়কার ফুড ডেলিভারি পার্টনার – এসব শুনে অনেকেই তাঁর স্টার্টআপের পরিকল্পনাকে খুব একটা পাত্তা দিতে চাননি।
এর পাশাপাশি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থের অভাব। তাঁর মতে, যেকোনও AI প্রযুক্তি তৈরি করতে বছরের পর বছর গবেষণা, উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। বাজারে তার মূল্য প্রমাণ হওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চালিয়ে যাওয়াই ছিল সবচেয়ে কঠিন লড়াই।
তবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়েও ঠিক যখন সূর্যের সংস্থা ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করেছে, তখনই জীবনে নেমে আসে আরেক বড় ধাক্কা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁর বাবা মারা যান। পেশায় তিনি ছিলেন রং মিস্ত্রি। ISI কলকাতার একটি অনুদান পেয়ে কোম্পানি গড়ার সব কাজ যখন প্রায় শেষ ঠিক তার দু’দিন পরেই বাবার মৃত্যু হয়। ফলে ছেলের সাফল্য আর বাবার দেখা হয়নি। (Suraj Biswas)
এই প্রসঙ্গে সূর্য বলেন, তাঁর বাবা সারাজীবন নিজের সব সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যখন ছেলে সেই সবকিছু ফিরিয়ে দেওয়ার মতো যোগ হয়ে উঠল, সেই সময়ই বাবার হাত মাথা থেকে সরে গেল। কিন্তু এই শোক সূর্যকে আটকাতে পারেনি বরং বাবাকে হারানোর আক্ষেপই তাঁকে আরও বড় স্বপ্ন দেখায়।
বাবার স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে তিনি Indots নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শুরু করেন। যার লক্ষ্য, এমন শিশুদের পাশে দাঁড়ানো, যাদের পরিবারের মানুষ হয়তো কোনওদিন তাদের সাফল্য দেখার সুযোগ পাবেন না।
মাঝে ২৫ বছরের ব্যবধান, তারপর মিলন, আজ গৌরী স্প্র্যাটের সঙ্গে নতুন জীবনে আমির খান
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গিয়েছে। কিন্তু AI এসে সূর্যকে এক নতুন পথ দেখিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েও যে বিজ্ঞান, মানুষের শরীর এবং মন নিয়ে নানান কাজ করা যায় সেটা সে বুঝেছিল। সেই থেকেই তাঁর স্টার্টআপের ভাবনা। বর্তমানে সূর্য বেঙ্গালুরুতে থাকেন, যেখানে তাঁর দ্বিতীয় স্টার্টআপের কাজ চলছে। তবে Assessli-র শিকড় এখনও পশ্চিমবঙ্গেই রয়েছে।
নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে সূর্যের বার্তা, সময়ের অপেক্ষা না করে নিজের স্বপ্নের জন্য এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। সাফল্য শুধু প্রতিভার উপর নির্ভর করে না, বরং অনিশ্চয়তাকে মেনে নিয়ে চেষ্টা করে যাওয়ার সাহসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে।
এই সূর্য বিশ্বাসের (Suraj Biswas) মতো লোকেরাই শেখান, যে যেখান থেকেই শুরু করুক না কেন সেটাকেই শেষ সীমা ভেবে নেওয়ার কিছু নেই। ছোট শহরে বড় হওয়া, অচেনা কলেজে পড়া বা একসময় ফুড ডেলিভারির কাজ করা, কোনও কিছুই মানুষকে বড় স্বপ্ন দেখার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। কারণ কোনও পেশাই জীবনের শেষ কথা নয়। জীবনের প্রতিটি মোড়ে আসে নতুন সুযোগ। শুধু একবার পিছনে না ফিরে সেই সুযোগের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে হয়তো এরকম আরও অনেক সূর্যেরা আকাশ জুড়ে তাদের আলো ছড়িয়ে দিতে পারবে।

