বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসসহ একাধিক বিরোধী দল সংসদে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি তুলেছে।
সোমবার, ৯ মার্চ, সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S Jaishankar) জানান, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাঁর মতে, এই উত্তেজনা কমানোর একমাত্র পথ হল কূটনৈতিক আলোচনা ও সংলাপ। তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা ভারতের জন্য সহজ নয়। পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় যোগাযোগ স্থাপন করতেও নানা সমস্যা হচ্ছে। তবুও ভারত বিভিন্ন কূটনৈতিক মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং উত্তেজনা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।”
তিনি জানান, “পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি ভারতীয় বাস ও কাজ করেন। পাশাপাশি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই দেশের বড় অংশের তেল ও গ্যাস আসে। সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়েছে। এর প্রভাব স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।”
ভারত সরকার শুরু থেকেই পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে বলেও জানান তিনি। ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং অনেক ভারতীয়কে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তেহরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসও প্রয়োজনীয় সহায়তা করছে। তিনি বলেন, ভারত শুরু থেকেই সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছেন।
জয়শঙ্কর (S Jaishankar) সংসদে জানান- এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৭ হাজার ভারতীয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। তবুও পশ্চিম এশিয়ায় থাকা ভারতীয়দের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর কথা অনুযায়ী, এই সংঘাতের জেরে ইতিমধ্যেই দুই জন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
তবে বিদেশমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নয় বিরোধী শিবির। তাদের দাবি, শুধুমাত্র বিদেশমন্ত্রীর একটি বিবৃতি যথেষ্ট নয়। এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা হওয়া উচিত। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেন, বিদেশ মন্ত্রীর একতরফা বিবৃতিতে সাধারণত নতুন তথ্য খুব একটা সামনে আসছে না এবং সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন করার সুযোগও থাকে না। তাই পশ্চিম এশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত বিতর্ক হওয়া দরকার।
তিনি অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, ২০০৩ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করেছিল, তখন লোকসভায় দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল এবং একটি প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছিল। সেই সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অটল বিহারি বাজপেই। জয়রাম রমেশ আরও বলেন, ১৯৬২ সালে যখন চীনের সঙ্গে যুদ্ধ চলছিল, তখনও প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সংসদে নিয়মিত আলোচনা করেছেন এবং সাংসদদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।
বিরোধীদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কাজ করেন এবং ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও ওই অঞ্চলের বড় ভূমিকা রয়েছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েই চলেছে। এরই মধ্যে সংসদে বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে যে জল্পনা শুরু হয়েছে আগামী দিনে এই বিষয়ে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।











