ব্রততী সিনহা রায়
Consultant Psychologist and Psychotherapist
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও নতুন উদ্যোগ ঘিরে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে (West Bengal Health Sector)। আয়ুষ্মান ভারত চালু থেকে শুরু করে সরকারি হাসপাতালে রোগী পরিষেবা আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করার উদ্যোগ, ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিসংখ্যান, ক্রিটিকাল কেয়ার পরিকাঠামো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবায় বাড়তি গুরুত্ব— সব মিলিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যখাত এখন বড় রূপান্তরের পথে। শুধু চিকিৎসা নয়, প্রশাসনিক কাঠামো ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতার ক্ষেত্রেও একাধিক নতুন পদক্ষেপ ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যপরিষেবার ছবিকে বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
- আয়ুষ্মান ভারত চালু হওয়া নিয়ে জোর আলোচনা: রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত চালুর প্রস্তুতি নিয়ে জোর চর্চা চলছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সাথীর সঙ্গে সম্ভাব্য সমন্বয় কীভাবে হবে, তা নিয়েও আলোচনা এগোচ্ছে। ক্যাশলেস চিকিৎসা, আরও বেশি হাসপাতালের সুবিধা এবং সম্ভাবনা এই তিনটি কারণে বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে বড় খবর হয়ে উঠেছে।
- সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া বন্ধে বাড়তি জোর: রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া বা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘোরানোর প্রবণতা কমাতে নতুন করে জোর দেওয়া হয়েছে। রোগী ভর্তির প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করা, হাসপাতালের শয্যা ম্যানেজমেন্টকে শক্তিশালী করা এবং অ্যাম্বুলেন্স রেসপন্স ambulance response system উন্নত করার কথাও উঠে এসেছে। সরকারি হাসপাতাল পরিষেবাকে আরও সক্রিয় করার দিকেই এখন ফোকাস। (West Bengal Health Sector)
- হাসপাতালে দালাল রাজ ঠেকাতে জিরো টলারেন্স নীতি: রাজ্য সরকার পরিচালিত হাসপাতালে মিডলম্যান বা দালালচক্র নিয়ে অভিযোগের পর কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে। কতগুলো বেড আছে সেই সংখ্যার লাইভ আপডেট দেওয়া ডিসপ্লে বোর্ড, বাধ্যতামূলক আইডি কার্ড এবং শক্তিশালী মনিটরিংয়ের মতো পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। রোগীদের হেনস্থা কমানো এবং হাসপাতালে স্বচ্ছতা বাড়ানোই এখন বড় লক্ষ্য।
- স্বাস্থ্য দফতরে বড়সড় পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। আয়ুষ্মান ভারত, স্বাস্থ্য সাথী, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন, ডেঙ্গি ম্যালেরিয়া প্রোগ্রাম, হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট, ড্রাগ ও সরঞ্জামসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাত এখন নতুনভাবে ভাগ করা হয়েছে। এর ফলে কোঅর্ডিনেশন থ্রি স্কিম প্রয়োগ আরও দ্রুত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
- কলকাতায় ডেঙ্গি-ম্যালেরিয়ার ট্রেন্ডে ইতিবাচক ছবি: KMC-র বাজেট অনুযায়ী, নথিবদ্ধ ডেঙ্গির ঘটনা ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫-এ প্রায় ৯১ শতাংশ কমেছে। ম্যালেরিয়ার ঘটনাও কমেছে ৪০ শতাংশ। বর্ষা ঘনিয়ে আসার সময়ে মশাবাহিত রোগ নিয়ে এই তথ্য জনস্বাস্থ্য আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। (West Bengal Health Sector)
- ৯টি সরকারি হাসপাতালে ক্রিটিকাল কেয়ার ব্লক তৈরি: পশ্চিমবঙ্গের ৯টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নির্দিষ্ট করে ক্রিটিকাল কেয়ার ব্লক তৈরির পরিকল্পনা এগোচ্ছে। কোথাও ৫০টি শয্যা, কোথাও ১০০টি শয্যা রাখা হচ্ছে। ভেন্টিলেটর, ডায়ালিসিস, MRI, অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটর, HDU, ট্রমা সাপোর্ট, আইসোলেশনের সুবিধা- সব মিলিয়ে গুরুতর রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
- মানসিক স্বাস্থ্য ও ট্রমা কেয়ারে বাড়তি গুরুত্ব: স্বাস্থ্য দপ্তরে মানসিক স্বাস্থ্য ও ট্রমা কেয়ারে আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, ফলে এই বিষয়টি এখন জনস্বাস্থ্য আলোচনায় নতুন করে উঠে আসছে।
দৈনন্দিন চাপ, চিন্তা, মানসিক ক্ষয়, দুর্ঘটনা বা ব্যক্তিগত ক্ষতির পর ট্রমা রেসপন্স এসব নিয়েও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। WHO বলছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের ফলে বিরক্তি, মনোযোগে ব্যাঘাত, ঘুমের সমস্যা, মাথা ব্যথা বা শরীরে ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কোনও ট্রমার ঘটনার পর দুঃস্বপ্ন, সেই ঘটনা বারবার ফিরে আসা, ভয়, এড়িয়ে চলা বা বাড়তি সতর্কতা থাকলে সেটি PTSD-র ওয়ার্নিং সাইন হতে পারে। (West Bengal Health Sector)
- টেলি-মানস (Tele-MANAS) ২৪০৭ হেল্পলাইন: কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর পশ্চিমবঙ্গে ‘টেলি-মানস’ (Tele Mental Health Assistance and Networking Across States) পরিষেবা পুরোদমে চালু করেছে।
- বাস্তব চিত্র: টোল-ফ্রি নম্বর (14416 বা 1800 891 4416)-এ কল করে যেকোনও সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ২৪ ঘণ্টা মানসিক অবসাদ, ট্রমা বা দুশ্চিন্তা নিয়ে সার্টিফাইড কাউন্সেলর এবং সাইকিয়াট্রিস্টদের সাথে সরাসরি বাংলায় কথা বলতে পারছেন।
- টেলিকনসালটেশন ও জেলা স্তরে স্ক্রিনিং: রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশিকা (যেমনটা নতুন স্পেশাল সেক্রেটারি ড: প্রীতি গোয়ালের দায়িত্বভার গ্রহণের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে) অনুযায়ী, জেলা হাসপাতাল এবং মহকুমা হাসপাতালস্তরে মানসিক স্বাস্থ্যের স্ক্রিনিং জোরদার করা হচ্ছে। ‘সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ (Suswasthya Kendra) গুলিতেও প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের পর প্রয়োজনে বড় হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সঙ্গে ভিডিয়ো কনসালটেশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। (West Bengal Health Sector)
বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন পরীক্ষা, ভালো ঘুম, ব্যায়াম, বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজনে পেশাদারের সাহায্য নেওয়া- মানসিক দিক থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বাস্থ্য সচেতনায় মানসিক চাপ দূর করা, ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় এবং কাউন্সেলিং সাপোর্ট নিয়ে আলাদা বিভাগ করা যেতে পারে।
বিশেষ বার্তা
স্বাস্থ্য নিয়ে আপস নয়। স্বাস্থ্যখাতে বদলের এই সময়ে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও সমান নজর দিন-সচেতন থাকুন, তথ্যভিত্তিক থাকুন, সুস্থ থাকুন।
লেখক পরিচিতি
ব্রততী সিনহা রায় একজন পেশাদার কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট এবং সাইকোথেরাপিস্ট। তবে তাঁর কাজের ধরনকে আলাদা করে তোলে তাঁর গভীর মানবিকতা ও হিউম্যানিস্টিক অ্যাপ্রোচ। তিনি শুধুমাত্র সমস্যার সাময়িক সমাধানে বিশ্বাসী নন; বরং মানুষের ভেতর থেকে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার পথ তৈরি করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
তিনি একটি হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ অনুসরণ করেন, যেখানে বিভিন্ন ধরনের থেরাপির পাশাপাশি মানুষের মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে স্পিরিচুয়াল দিককেও গুরুত্ব দেন। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তিনি মানুষের মানসিক কষ্টকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছে মানুষের পাশে থাকার, তাদের ভালো রাখার এবং তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এক আন্তরিক ইচ্ছা।
এই বিশ্বাস এবং শিক্ষা থেকেই তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত আরও সমৃদ্ধ করে তুলছেন—শুধু একজন পেশাদার হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও—যাতে তিনি অন্যদের জীবনে সত্যিকারের সুস্থতা ও শান্তি নিয়ে আসতে পারেন।

