সব গল্প শুরু হয় পরিকল্পনা করে না। কিছু গল্প তৈরি হয় ঘটনাচক্রে, কিছু সিদ্ধান্ত নেয় সময়, আর কিছু সিদ্ধান্ত নেয় জীবন নিজেই। (Prabhsukhan Singh Gill) প্রভসুখন সিংহ গিলের ফুটবল জীবনও ঠিক তেমন। যে ছেলেটা ছোটবেলায় নিজের দাদাকে দেখে ডিফেন্ডার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই ছেলেই আজ গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে ইতিহাস লিখেছেন। আর সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে ইস্টবেঙ্গলের বহু প্রতীক্ষিত আইএসএল সাফল্য।
লুধিয়ানার ছেলে প্রভসুখনের প্রথম ফুটবল-প্রেরণা ছিলেন তাঁর দাদা গুরসিমরত গিল। দাদাকে দেখে ডিফেন্সে খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনিও। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়টা এল এক ট্রায়ালে।
চণ্ডীগড় ফুটবল অ্যাকাডেমিতে ট্রায়াল দিতে গিয়ে কোচদের নজর কাড়ে তাঁর উচ্চতা। সেই সময় ট্রায়ালে আসা ফুটবলারদের মধ্যে কোনও গোলরক্ষক ছিলেন না। কোচদের পরামর্শ—একবার গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে দেখো। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় সবকিছু। প্রথম সুযোগেই নিজেকে প্রমাণ করেন (Prabhsukhan Singh Gill) প্রভসুখন। একটি প্রতিযোগিতায় সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার পান। সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন যাত্রা—ডিফেন্ডার হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে গোলরক্ষক হয়ে ওঠার গল্প।
আজকের ফুটবলে গোলরক্ষকদের একটা প্রবণতা স্পষ্ট—উঁচু বল এলে অনেকেই সরাসরি গ্রিপ করার বদলে ফিস্ট করে বিপদমুক্ত করতে চান। কিন্তু প্রভসুখন সেই পুরনো ধারার বিরল প্রতিনিধি। বল নিয়ন্ত্রণে তাঁর গ্রিপ, সময়জ্ঞান এবং শান্ত থাকা তাঁকে আলাদা করেছে। গোলকিপিংয়ে যেন এক ধরনের ট্র্যাডিশনাল সৌন্দর্য দেখা যায় তাঁর খেলায়।
পরিসংখ্যানও সেই উন্নতির সাক্ষী। ২০২৩ সালে কেরল ব্লাস্টার্স থেকে ইস্টবেঙ্গলে যোগ দেন প্রভসুখন। তৎকালীন কোচ কার্লেস কুয়াদ্রাতের নজরে পড়েছিলেন তিনি। পরে কোচ বদলেছে, এসেছেন অস্কার ব্রুজো—কিন্তু গোলপোস্টের সামনে গিলের জায়গা ও গুরুত্ব বদলায়নি।
সদ্য শেষ হওয়া আইএসএলে ১৩ ম্যাচে পাঁচ বার ক্লিন শিট রেখেছেন তিনি (Prabhsukhan Singh Gill)। পুরো মরসুমে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯। আরও গুরুত্বপূর্ণ, ২০২৩-২৪ মরসুমে তাঁর সেভ পার্সেন্টেজ যেখানে ছিল ৬৭.১ শতাংশ, সেখানে ২০২৫-২৬ মরসুমে তা পৌঁছে গিয়েছে ৭৫.৭ শতাংশে। সংখ্যার ভাষাতেই স্পষ্ট তাঁর উন্নতি।
লাল হলুদের মশালের উজ্জ্বলতা শুধু একটা ট্রফি জয়েই সীমাবদ্ধ নয়
মরসুম শেষ। এখন তিনি ফিরে গিয়েছেন লুধিয়ানার নিজের গ্রামে। যে গ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত—যেখানে বড় হওয়ার মধ্যে আছে সাহস, সরলতা আর ভয়হীন এক মানসিকতা। তবে আইএসএল জিতে ফিরে গিয়ে নায়কোচিত সংবর্ধনায় ভেসে যাননি। পেয়েছেন গ্রামের মানুষের ‘সাবাশি’, পিঠ চাপড়ে দেওয়া স্বীকৃতি।
কিন্তু কলকাতায় ছবিটা একেবারে আলাদা। ইস্টবেঙ্গলের আইএসএল জয়ের উন্মাদনা এখনও রয়ে গেছে শহরের অলিতে-গলিতে। সমাজমাধ্যম খুললেই উঠে আসছে নানা মুহূর্তের বিশ্লেষণ। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফিরে আসছে দুটো দৃশ্য। এক—বেঙ্গালুরু এফসির বিরুদ্ধে অ্যান্তন সয়বার্গের শেষ মুহূর্তের গোল। আর দুই—ডার্বিতে জেমি ম্যাকলারেনের শটের সামনে এগিয়ে এসে বাঁ-পা দিয়ে অবিশ্বাস্য সেভ করে দেওয়া প্রভসুখন গিল।
সমর্থকদের অনেকেই বলছেন—“ওই বাঁ-পা-ই ২২ বছরের অপেক্ষা শেষ করেছে।” তবে এই তুলনা, এই প্রশংসা শুনে নিজের অবস্থান খুব স্পষ্ট রেখেছেন প্রভসুখন। (Prabhsukhan Singh Gill) তাঁর কথায়, “এমিলিয়ানো কিংবদন্তি গোলরক্ষক। তাঁর সঙ্গে আমার তুলনা করা ঠিক নয়। দলকে ট্রফি দিতে পেরেছি—এর থেকে ভালো অনুভূতি আর কিছু নেই।”
জিয়ানলুইজি বুঁফোর ভক্ত (Prabhsukhan Singh Gill) প্রভসুখন জানালেন, ওই ঐতিহাসিক সেভের ছবিটা এক সমর্থক ফ্রেম করে উপহার দিয়েছেন তাঁকে। “আমি সেটা শোওয়ার ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখেছি। প্রতিদিন অন্তত একবার ছবিটা দেখি। নিজেকে মনে করিয়ে দিই—আরও ভালো করতে হবে।” কলকাতার সমর্থকদের নিয়েও আবেগ ধরা দেয় তাঁর কথায়। তিনি বলেন, “কলকাতার সমর্থকদের মতো উন্মাদনা কোথাও পাইনি। কলকাতা আমার দ্বিতীয় ঘর হয়ে গিয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব ইস্টবেঙ্গলে ফিরতে চাই।”
অনূর্ধ্ব-২৩ ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব করলেও এখনও সিনিয়র জাতীয় দলে অভিষেক হয়নি তাঁর। ট্রফি জয়ের আনন্দের মধ্যেও সেই অপূর্ণতার সুর রয়ে গেছে। (Prabhsukhan Singh Gill) প্রভসুখনের কথায়, “দেশের প্রতিনিধিত্ব করা আমার কাছে গর্বের। একজন ফুটবলারের কাছে এর চেয়ে বড় কিছু হয় না। আমার কাজ পরিশ্রম করে যাওয়া। আশা করি সামনে আরও এমন গর্বের মুহূর্ত আসবে।”
একটা ট্রায়ালের সিদ্ধান্ত তাঁকে গোলপোস্টে দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু বাকিটা তৈরি করেছেন তিনি নিজে—শান্ত হাতে, দৃঢ় মানসিকতায় আর প্রতিদিন একটু করে আরও ভালো হওয়ার ইচ্ছায়। আর সেই কারণেই আজ প্রভসুখন গিল শুধু একজন গোলরক্ষক নন—তিনি হয়ে উঠছেন হাজার হাজার সমর্থকের ভরসার নাম। ডার্বির সেই বাঁ-পায়ের সেভ হয়তো ট্রফির পথে সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে, কিন্তু প্রভসুখনের আসল জয় লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়—প্রতিদিন নিজেকে আরও ভালো করে তোলার লড়াইয়ে। লুধিয়ানার ছোট্ট গ্রাম থেকে কলকাতার আবেগের কেন্দ্র হয়ে ওঠার এই সফর এখনও শেষ হয়নি—কারণ তাঁর চোখ এখন দেশের জার্সিতে, আরও বড় স্বপ্নে।
ভারতীয়র লেন্সে ধরা পড়বে ফিফা বিশ্বকাপের মুহূর্ত, ইতিহাস গড়লেন গীতিকা তালুকদার

