কুশল চক্রবর্তী
ট্রফি জয়ের ব্যর্থতার কথা সব ক্লাবের ইতিহাসেই লেখা থাকে (East Bengal FC ISL Champion)। রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, বায়ার্ন মিউনিখ সবারই কোন না কোনও সময় একটা বিশেষ ট্রফি জিততে অনেক দিন লেগে গিয়েছে। তার মানে এই নয় সেই সময়টায় সেই প্রথিতযশা ক্লাব, দেশের বা বিশ্বের মানচিত্র থেকে একবারে হারিয়ে গিয়েছে। প্রবাদ বলে, যে সয়, সেই রয়। দর্শক সমর্থকপুষ্ট ক্লাবগুলো একটি ট্রফিতে ক্রমাগত শীর্ষে না পৌঁছতে পারলেও তারা সবসময়ই যারা সেই ট্রফির পরিশেষে শিরোপা অর্জন করে, তাদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দেখা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তারা অন্য কোনও ট্রফিতে নিজেদের অস্তিত্বও ভালোভাবে জানান দিতে থাকে।
এবার ২২ বছর পরে ইস্টবেঙ্গল প্রথমবারের জন্য ভারতীয় ফুটবলের এই মুহূর্তের সেরা ট্রফি ISL জিতেছে। তার ফলে অনেকে বলবার চেষ্টা করেছেন ইস্টবেঙ্গল যেন এতদিন ধরে পাদপ্রদীপের আলোতেই ছিল না। এমন কথাই বোঝানো হচ্ছিল যে ISL জয়ই যেন ভারতীয় ফুটবলের একমাত্র ট্রফি, যা না জিতলে শতবর্ষ অতিক্রান্ত একটা ক্লাবের অস্তিত্বই থাকে না। এটা যে কতটা সত্যি তা পরিসংখনই বলে দেবে।
প্রথমত ISL শুরু হয়েছে মাত্র ১১-১২ বছর আগে। এবং যে শর্তে এই প্রতিযোগিতায় দলগুলো খেলতে পারবে ঠিক হয়েছিল, তাতে ইস্টবেঙ্গলের খেলারই কোনও কথা ছিল না। অবশেষে ইস্টবেঙ্গল এই প্রতিযোগিতায় খেলতে পায় ২০২০-২১ সালে। তাহলে বলতে গেলে ইস্টবেঙ্গল এই প্রতিযোগিতায় যোগদান করার ৫ বছর বাদে শীর্ষস্থান দখল করল। সেক্ষেত্রে ২০০৫ থেকে ২০২৫ অবধি ইস্টবেঙ্গলের আইলিগ বা ইন্ডিয়ান সুপার লিগ জয়ের ব্যর্থতার কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ সেই দুই লিগে এই সময়ের মধ্যে ইস্টবেঙ্গল যে শিরপা পায়নি তা ঠিক, কিন্তু জাতীয় লিগ আর আই লিগ প্রতিযোগিতায় ইস্টবেঙ্গলের খেলার পরিসংখ্যান কিন্তু যথেষ্ট ভালো। যেমন অন্তত ৬ বার এই সময়ের মধ্যে তারা আই লিগে রানার্স হয়েছে, জাতীয় লিগ আর আইলিগ প্রতিযোগিতা মিলিয়ে যে দলগুলো খেলছে তাদের মধ্যে ইস্টবেঙ্গল ২৪৮ টি ম্যাচে জয়ী হয়ে রেকর্ড গড়েছে। শুধু তাই নয়, এই দুই লিগ মিলিয়ে ইস্টবেঙ্গলের গোলের সংখ্যা ৭৫৪টি। যাতে কি না অন্য সব দলকে ইস্টবেঙ্গল পিছনে ফেলে দিয়েছে।
আর এই ২০০৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল অবধি ইস্টবেঙ্গল ক্লাব জিতেছে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা ট্রফি ফেডারেশন কাপ (৫ বার), সুপার কাপ
(২ বার), IFA শিল্ড (১ বার), কলকাতা ফুটবল লিগ (১১ বার), এমনকি এই সব প্রতিযোগিতায় ইস্টবেঙ্গল তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানকে হারিয়েও ট্রফি জিতেছে।
অন্য দিকে দেখুন, মোহনবাগান ১৯১১ সালে ইংরেজ দলকে হারিয়ে IFA শিল্ড জিতেছিল। মোহনবাগানকে কিন্তু পরেরবার শিল্ড জেতার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৩৬ বছর। কারC ১৯১১-র পর মোহনবাগান শিল্ড জেতে ১৯৪৭ সালে। এর পর আবার ২০০৩ সালের পর মোহনবাগান IFA শিল্ড জেতে ২০২৫ সালে। মানে এখানেও তাদের ২২ বছর অপেক্ষা করতে হয় এই ট্রফি জিততে। এমনকি এই যে আইলিগ, যা নিয়ে এত কথা হচ্ছে, মোহনবাগান ২০০১-০২ সালে আই লিগ (তখন জাতীয় লিগ) জেতার পর তাদের ১২ বছর অপেক্ষা করতে হয় পরের আইলিগ জেতার জন্য। ২০১৪-১৫ সালে তারা আবার আই লিগ জেতে। কলকাতার লিগ যা কি না এখন CFL বলে পরিচিত, মোহনবাগান ২০০৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল অবধি মাত্র একবার ২০১৮ সালে জিতেছে।
ভারতবর্ষের প্রাচীনতম ফুটবল প্রতিযোগিতা ডুরান্ড কাপ মোহনবাগান জেতে ২০০০ সালের পর ২০২৩ সালে। মানে তাদের এই প্রতিযোগিতা
জেতার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ২৩ বছর। অতএব এটা বুঝতেই পারছেন শতাব্দী অতিক্রান্ত ক্লাবগুলোর খারাপ-ভালো সময় যায়। বরঞ্চ এটা বলা যায় যে খারাপ সময়েকে সরিয়ে রেখে স্বমহিমায় যারা ফিরতে পারে তারাই তো কালজয়ী বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।













1 thought on “লাল হলুদের মশালের উজ্জ্বলতা শুধু একটা ট্রফি জয়েই সীমাবদ্ধ নয়”