পথ চলা শুরু হয়েছিল ১৯২০ তে। তবে এখনও অটুট সেই ঐতিহ্য, আবেগ, ইতিহাস গড়ে চলার লড়াই। গতকাল ছিল সেই লাল হলুদ শিবিরের এক গর্বের দিন। ১ আগস্ট, ২০২৬ ক্লাবের ১০৭তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন করল ইস্টবেঙ্গল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একাধিক কর্মসূচির মধ্য দিয়েই যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে ক্লাবের প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হয়। ক্লাব তাঁবু থেকে নজরুল মঞ্চ— সর্বত্রই ছিল লাল-হলুদ সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী, প্রাক্তন-বর্তমান ফুটবলার সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।
সকালে পতাকা উত্তোলন, প্রতিষ্ঠাতাকে শ্রদ্ধা
দিনের শুরুতেই ক্লাব তাঁবুতে লাল-হলুদ পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সুরেশচন্দ্র চৌধুরীর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে ক্লাব কর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন অধিনায়ক ভাস্কর গাঙ্গুলি, বিকাশ পাঁজি-সহ একাধিক প্রাক্তন ফুটবলার। (East Bengal Foundation Day)
নজরুল মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উদ্বোধন
বিকেলে নজরুল মঞ্চে বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী রূপঙ্কর বাগচীর সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব। এরপর ক্লাব সভাপতি মুরারী লাল লোহিয়ার উদ্বোধনী ভাষণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান শুরু হয়।
মঞ্চে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের দুই মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ ও কৌশিক চৌধুরী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সমরেশ চৌধুরী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, ভাস্কর গাঙ্গুলি, প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, অলোক মুখোপাধ্যায়, মিহির বসু-সহ বহু প্রাক্তন ফুটবলার। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন ক্রিকেটার সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ঝুলন গোস্বামী এবং স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও। মহারাজের সাথে সৌহার্দ্য বিনিময় করতে দেখা যায় দলের হেডকোচ আন্তোনিও হাবাসকেও।

বাঙালি ফুটবলার তৈরিতে আরও দায়িত্ব নেওয়ার বার্তা
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, বর্তমানে বাঙালি ফুটবলারের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে ইস্টবেঙ্গলের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যতে ক্লাবের আরও সাফল্য কামনা করেন।
অন্যদিকে মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বলেন, ইস্টবেঙ্গল শুধু একটি ক্লাব নয়, এটি মাটির গন্ধ ও আবেগের প্রতীক। ছোটবেলায় রায়গঞ্জে সাইকেলে ইস্টবেঙ্গলের পতাকা নিয়ে ঘোরার স্মৃতিও তিনি ভাগ করে নেন এবং ক্লাবের ভবিষ্যৎ সাফল্যের আশা প্রকাশ করেন।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, বিজ্ঞানী ও শিল্পমন্ত্রীকে সংবর্ধনা
অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় এবং বিজ্ঞানী ড. জিষ্ণু বসুকে সংবর্ধিত করা হয়।
জিষ্ণু বসু বলেন, জীবনের প্রথম যে পতাকা তিনি হাতে ধরেছিলেন, সেটি ছিল ইস্টবেঙ্গলের পতাকা। তাঁর কথায়, “ইস্টবেঙ্গল আমাকে শিখিয়েছে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। ইস্টবেঙ্গল মানেই প্রতিবাদ, সাহস এবং সংগ্রামের প্রতীক।”
সুকান্ত মজুমদার বলেন, ইস্টবেঙ্গল শুধু একটি ক্লাব নয়, ওপার বাংলার মানুষের লড়াই ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।
শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় ইস্টবেঙ্গলের ১০৭ বছরের ইতিহাস স্মরণ করে ক্লাবের বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান এবং নিজের ময়দানের নানা স্মৃতিও তুলে ধরেন।
সম্মানিত প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও কৌশিক গাঙ্গুলি
এদিন ‘এক্সিলেন্স ইন মুভি অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয় বিশিষ্ট পরিচালক ও অভিনেতা কৌশিক গাঙ্গুলীকে। প্রাক্তন ফুটবলার মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও অলোক মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে সম্মান গ্রহণ করে তিনি বলেন, ফুটবলের কিংবদন্তিদের হাত থেকে এই সম্মান পাওয়া তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি বলেই মনে করেন তিনি। (East Bengal Foundation Day)
অন্যদিকে ‘সুপার অ্যাচিভার অ্যাওয়ার্ড’ পান বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ইস্টবেঙ্গলের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস তাঁর হাতে সম্মান তুলে দেন। সম্মান গ্রহণ করে প্রসেনজিৎ ‘আশ্রয়’ ছবিতে লাল-হলুদ জার্সি পরে অভিনয়ের স্মৃতি ভাগ করে নেন।

অর্থমন্ত্রী ও সাংবাদিকদেরও সম্মাননা
রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তকে সংবর্ধিত করা হয়। তিনি বলেন, ইস্টবেঙ্গল শুধু খেলাধুলার ক্ষেত্রেই নয়, বাংলার সংস্কৃতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
অজয় বসু স্মৃতি সেরা সাংবাদিক সম্মান পান সাংবাদিক বিক্রান্ত গুপ্ত। অন্যদিকে পুষ্পেন সরকার স্মৃতি সেরা স্পোর্টস ফটো জার্নালিস্ট সম্মান পান বিশিষ্ট চিত্রসাংবাদিক শঙ্কর নাগ দাস।
লাল-হলুদের ১০৭-এ আবেগের জোয়ার, শিলিগুড়িতে ইস্টবেঙ্গল দিবসে স্টেডিয়াম নিয়ে বড় আশ্বাস শঙ্কর ঘোষের
‘ভারত গৌরব’ সম্মানে সঞ্জীব সান্যাল ও প্রীতম চক্রবর্তী
চলতি বছরে ‘ভারত গৌরব অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সঞ্জীব সান্যাল এবং সংগীত পরিচালক প্রীতম চক্রবর্তীকে।
সম্মান গ্রহণ করে সঞ্জীব সান্যাল এই পুরস্কার তাঁর ছোটবেলার বন্ধু নীলাদ্রি মজুমদারকে উৎসর্গ করেন। প্রীতম চক্রবর্তী বলেন, ইস্টবেঙ্গল তাঁর কাছে শুধু একটি ক্লাব নয়, একটি পরিবার।
ক্রীড়ামন্ত্রীর ট্রফি জয়ের প্রত্যাশা
অনুষ্ঠানে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। বক্তব্যে তিনি ডুরান্ড কাপে দলের বড় জয়ের জন্য কোচ ও ফুটবলারদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আগামী বছর প্রতিষ্ঠা দিবসের আগে যেন ইস্টবেঙ্গল সব ট্রফি জিতে নিতে পারে, এমনটাই তাঁর প্রত্যাশা।

বর্ষসেরা ফুটবলার থেকে লাইফটাইম সম্মান- অনুষ্ঠানে একাধিক বিভাগে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার: আনোয়ার আলি
মহিলা ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার: সাথী দেবনাথ
ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার: রীতম পোড়েল
জীবন চক্রবর্তী স্মৃতি উদীয়মান ফুটবলার: এডমুন্ড লালরিনডিকা
প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মান: বিনো জর্জ
সাপোর্টার অফ দ্য ইয়ার: মনোময় ভট্টাচার্য, কল্পনা চক্রবর্তী, শ্যামল মজুমদার ও রিজু দাস
প্রাইড অফ বেঙ্গল অ্যাওয়ার্ড: সুলঞ্জনা রাউল
পঙ্কজ গুপ্ত ও প্রতুল চক্রবর্তী স্মৃতি সম্মান: প্রাক্তন রেফারি ভোলানাথ দত্ত ও পীযুষ রায়
লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড: প্রাক্তন অধিনায়ক বলাই মুখার্জি ও তরুণ দে
প্রাক্তন তারকাদের উপস্থিতিতে বাড়ল অনুষ্ঠানের জৌলুস
অনুষ্ঠানে ইস্টবেঙ্গলের বহু প্রাক্তন ফুটবলার, ক্রীড়াবিদ এবং লাল-হলুদ সমর্থকদের উপস্থিতি উৎসবের আবহ আরও বাড়িয়ে তোলে। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট ক্রীড়াসাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য।
১০৭ বছরে নতুন স্বপ্নের বার্তা
এতদিনের ঐতিহ্য, অতীতের স্মৃতিচারণা, বর্তমানের সম্মাননা এবং ভবিষ্যতের সাফল্যের প্রত্যাশা— সব মিলিয়ে ১০৭তম প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠান হয়ে উঠল ইস্টবেঙ্গল পরিবারের এক জাঁকজমকপূর্ণ মিলনমেলা। ক্লাবের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সংগ্রামের উত্তরাধিকারদের সামনে রেখে আগামী দিনে আরও বড় সাফল্যের লক্ষ্যে এগিয়ে চলার বার্তাই উঠে এল এই বিশেষ অনুষ্ঠানে।












