ননেইয়ের পাহাড়ি পথ ধরে যে স্বপ্ন একদিন নিঃশব্দে হাঁটতে শুরু করেছিল, সোমবার বিকেলে ইম্ফলের খুমান লাম্পাক স্টেডিয়ামে সেই স্বপ্নই যেন গর্জে উঠল। (FC Raengdai) মাত্র চার বছরেরও কম বয়সী এফসি রেংদাই নিজেদের প্রথম ডুরান্ড কাপেই লিখে ফেলল আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়। মণিপুর ডার্বিতে ট্রাউ এফসিকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে শুধু তিন পয়েন্টই নয়, লিগের শীর্ষস্থানও দখল করল পাহাড়ি জেলার এই নবীন ক্লাব। আর এই রূপকথার কেন্দ্রে ছিলেন একটাই নাম—মৃদুল দোলে, যিনি হ্যাটট্রিক করে ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে দিলেন নিজের নাম।

FC Raengdai: কাদামাটির মাঠ থেকেই শুরু
পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে, ধানের খেত আর কাদামাটির সরু পথ ধরে মণিপুরের ননেই পৌঁছাতে হয়। মণিপুরের ননেই জেলার খৌপুম উপত্যকায় ফুটবল কোনও বিলাসিতা নয়, জীবনযাপনেরই অংশ। ধান কাটার পর ফাঁকা হয়ে যাওয়া জমিই ছেটদের কাছে হয়ে ওঠে ফুটবল মাঠ। সেই মাঠেই বড় হয়েছেন টিংকাওচুন গাংমেইদের মতো ফুটবলাররা। ননেই জেলা বহুদিন ধরেই প্রতিভার আঁতুড়ঘর। স্থানীয় স্কুল ফুটবল থেকে শুরু করে রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন যুব লিগ—সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রজন্ম। এই প্রতিভাগুলোর জন্যই ২০২২ সালের নভেম্বরে জন্ম নেয় এফসি রেংদাই। জেলিয়াংরং সম্প্রদায়ের প্রতীক ‘হর্নবিল’ পাখির নামে নাম রাখা হয় ক্লাবের। কারণ এই পাখি নেতৃত্ব, ঐক্য, সাহস ও আশার প্রতীক। ক্লাবের লক্ষ্যও ছিল একটাই—ননেই ও তামেংলংয়ের প্রতিভাদের জাতীয় মঞ্চে তুলে ধরা। যা আজ বাস্তব।

FC Raengdai: ডার্বির শুরুতেই মৃদুলের ঝড়

ট্রাউয়ের বিরুদ্ধে মণিপুর ডার্বিই ছিল দলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ডুরান্ড কাপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে রেংদাই। ১৪ মিনিটেই গোল করে দলকে এগিয়ে দেন মৃদুল দোলে। মাত্র ১০ মিনিট পর, ২৪ মিনিটে আবারও জালে বল জড়ান তিনিই। দুই গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরও থামেনি রেংদাই। ৪৩ মিনিটে ট্রাউয়ের হয়ে ব্যবধান কমান চানাম আকাশ মেইতেই। তবে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই ৪৫+২ মিনিটে চংথাম কিশান সিং গোল করে স্কোরলাইন দাঁড় করান ৩-১। পাহাড়ি ক্লাবের আত্মবিশ্বাস তখন আকাশছোঁয়া।
প্রাক-সুব্রত কাপে ফুটবলের নতুন স্বপ্ন, ৩০% বেশি অংশগ্রহণে উচ্ছ্বসিত শিক্ষামন্ত্রী
ফিরে এল ট্রাউ, তবু হার মানেনি রেংদাই
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই ম্যাচের মোড় ঘুরতে থাকে। ৪৭ মিনিটে ট্রাউয়ের হয়ে গোল করেন আফদাল ভারিক্কোদান। ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩-২। এরপর ৬৭ মিনিটে রেংদাইয়ের লাঞ্চুংগ্রেই পামেইয়ের আত্মঘাতী গোলে ম্যাচে সমতা ফেরায় ট্রাউ। স্কোরলাইন ৩-৩। ডার্বি তখন নতুন করে শুরু হয়েছে বললেও ভুল হবে না।
Hat-trick hero. Player of the Match. Hear from Doley after a sensational performance.
— Durand Cup (@thedurandcup) August 3, 2026
Watch live on @SonySportsNetwk & @SonyLIV #TRAUFCR #135thEditionofIndianOilDurandCup #PoweredbySBIandCIL #DeshKaCup #ManyChampionsOneLegacy pic.twitter.com/qnwDvbjRpY
কিন্তু বড় দল আর বড় গল্পের পার্থক্য গড়ে দেন বড় ফুটবলাররাই। ৭৯ মিনিটে আবার সামনে এলেন মৃদুল দোলে। নিখুঁত ফিনিশে নিজের তৃতীয় গোল করে সম্পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক, আর (FC Raengdai) রেংদাইকে এনে দেন ঐতিহাসিক ৪-৩ ব্যবধানের জয়।
হ্যাটট্রিকের চেয়েও বড় এক বার্তা
কয়েকদিন আগেই ভারতীয় নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে ডুরান্ড কাপে প্রথম জয় পেয়েছিল (FC Raengdai) রেংদাই। সেই ম্যাচে প্রথম ডুরান্ড গোলও এসেছিল ক্লাবের ইতিহাসে। এবার ট্রাউয়ের বিরুদ্ধে ডার্বি জিতে তারা প্রমাণ করে দিল, সেই জয় কোনও অঘটন ছিল না। বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ফুটবল যাত্রার ধারাবাহিকতা।
প্রধান কোচ বীরবল সিং ক্ষেত্রিময়ুম শুরু থেকেই তরুণ ভারতীয় ফুটবলারদের উপর আস্থা রেখেছেন। বিদেশি ফুটবলারের বদলে স্থানীয় প্রতিভাদের নিয়েই তিনি ভবিষ্যতের দল গড়েছেন। মণিপুর প্রিমিয়ার লিগ থেকে আই-লিগ ৩, তারপর আই-লিগ ২-এ ওঠার পথ পেরিয়ে এখন ডুরান্ড কাপে সেই পরিশ্রমের প্রতিফলন স্পষ্ট।
FC Raengdai: স্বপ্ন পূরণ রেংদাইয়ের
ট্রাউয়ের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়। ডুরান্ড কাপের লিগ তালিকায় নবম স্থানে থাকা রেংদাই এক লাফে উঠে গেল গ্রুপের শীর্ষে। চার বছরেরও কম বয়সী একটি ক্লাবের কাছে এটি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক সাফল্য।

ননেইয়ের পাহাড়ে এখনও হয়তো বড় স্টেডিয়াম নেই, নেই ঝলমলে ফ্লাডলাইটও। কিন্তু সেখানে আছে স্বপ্ন, সাহস আর লড়াই করার মানসিকতা। সেই আলোই আজ ইম্ফলের খুমান লাম্পাকে ছড়িয়ে পড়েছে। মৃদুল দোলের হ্যাটট্রিক হয়তো স্কোরশিটে তিনটি গোল হিসেবেই লেখা থাকবে, কিন্তু ননেইয়ের মানুষের কাছে এটি আরও বড় কিছু—নিজেদের পরিচয়, নিজেদের অস্তিত্ব আর পাহাড়ের স্বপ্নকে দেশের ফুটবল মানচিত্রে স্থায়ীভাবে লিখে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
গ্লাসগোতে ভারতীয় রেস্তোরাঁয় ‘ভুল’ ভারতের মানচিত্র; ক্ষোভে ফুঁসলেন লভলিনা













1 thought on “ননেইয়ের পাহাড় থেকে ডুরান্ডের শীর্ষে, রেংদাইয়ের রূপকথা লিখলেন হ্যাটট্রিক নায়ক মৃদুল”
Comments are closed.