ফুটবলকে এতদিন বলা হতো ‘গেম অফ টু হাফস’— অর্থাৎ ৪৫ মিনিটের দুই অর্ধে বিভক্ত ৯০ মিনিটের খেলা। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই পরিচয়ই বহন করে এসেছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটি। কিন্তু ২০২৬ FIFA World Cup-এ সেই চেনা ছবিতে আসছে বড় পরিবর্তন। নিয়মপুস্তকে এখনও দুই অর্ধের ম্যাচই থাকছে, তবে বাস্তবে (FIFA World Cup 2026) বিশ্বকাপের ম্যাচ অনেকটাই ‘চার কোয়ার্টারের’ রূপ নিতে চলেছে।
কানাডা, মেক্সিকো ও আমেরিকায় যৌথভাবে আয়োজিত হতে চলা ২০২৬ বিশ্বকাপে FIFA বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ম্যাচের প্রতিটি অর্ধ কার্যত দু’টি অংশে ভাগ হয়ে যাবে। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিষয়টি নতুন হলেও এর পিছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
কেন চার কোয়ার্টারের মতো দেখাবে ম্যাচ?
(FIFA World Cup 2026) নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি অর্ধে প্রায় ২২ মিনিট খেলা হওয়ার পর তিন মিনিটের জন্য খেলা বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ প্রথমার্ধে ২২ মিনিটের মাথায় এবং দ্বিতীয়ার্ধে প্রায় ৬৭ মিনিটের সময় বাধ্যতামূলক বিরতি নেওয়া হবে।
এই বিরতির সময়সীমা হবে তিন মিনিট। এরপর আবার খেলা শুরু হবে। ফলে একটি ম্যাচের কাঠামো দাঁড়াবে—
- প্রথম কোয়ার্টার: কিক-অফ থেকে ২২ মিনিট
- হাইড্রেশন ব্রেক (৩ মিনিট)
- দ্বিতীয় কোয়ার্টার: প্রথমার্ধের বাকি অংশ
- হাফটাইম (১৫ মিনিট)
- তৃতীয় কোয়ার্টার: দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ২২ মিনিট
- হাইড্রেশন ব্রেক (৩ মিনিট)
- চতুর্থ কোয়ার্টার: ম্যাচের শেষ অংশ
অবশ্যই এই অতিরিক্ত সময় ম্যাচের স্টপেজ টাইমে যোগ করা হবে।
আরও পড়ুন: মিলল না প্রবেশের অনুমতি, বিমানবন্দর রেফারিকে ফিরিয়ে দিল আমেরিকা, বিশ্বকাপের আগে ফের বিতর্ক
FIFA কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল?
মূল কারণ খেলোয়াড়দের সুরক্ষা। (FIFA World Cup 2026) ২০২৬ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে জুন-জুলাই মাসে, যখন উত্তর আমেরিকার বহু শহরে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা অত্যন্ত বেশি থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রায় খেলা চালিয়ে গেলে খেলোয়াড়দের হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি থাকতে পারে।
(FIFA World Cup 2026) বিশ্বকাপ এবার ৩২ নয়, ৪৮ দলের। ফলে ম্যাচের সংখ্যাও বাড়ছে। ব্যস্ত সূচির মধ্যে খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে FIFA।
এর আগে কাতার বিশ্বকাপে বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘কুলিং ব্রেক’ দেখা গিয়েছিল। তবে তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল রেফারিদের হাতে। এবার সব ম্যাচেই একই নিয়ম কার্যকর হবে, যাতে কোনও দলের জন্য আলাদা সুবিধা বা অসুবিধা না তৈরি হয়।
কোচদের জন্য নতুন অস্ত্র
এই বিরতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কৌশলগত সুবিধা। সাধারণত ফুটবলে প্রথমার্ধ বা দ্বিতীয়ার্ধ চলাকালীন কোচদের খেলোয়াড়দের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করার সুযোগ থাকে না।
কিন্তু নতুন হাইড্রেশন ব্রেকের সময় কোচরা সরাসরি খেলোয়াড়দের নির্দেশ দিতে পারবেন। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন, ফরমেশন বদল বা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
ফলে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, (FIFA World Cup 2026) বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার ধরনেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। অনেকটা বাস্কেটবল বা আমেরিকান ফুটবলের টাইম-আউট সংস্কৃতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এই তিন মিনিট।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি তারিখ ও ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের সময়সূচি
বিতর্কও কম নয়
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একাংশের মতে, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের প্রশ্নে FIFA সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় খেলার চাপ কমাতে এই বিরতি কার্যকর হবে।
অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার নিরবচ্ছিন্ন গতি। (FIFA World Cup 2026) বারবার খেলা থামলে ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হতে পারে। অনেকেই এটিকে ফুটবলের ‘আমেরিকানাইজেশন’ বলেও কটাক্ষ করছেন। কারণ NBA, NFL কিংবা আইস হকির মতো খেলায় কোয়ার্টারভিত্তিক কাঠামো বহুদিন ধরেই রয়েছে।
আরও একটি প্রশ্ন উঠছে— কানাডার তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ার স্টেডিয়ামেও কেন একই নিয়ম বাধ্যতামূলক হবে? FIFA-এর জবাব, বিশ্বকাপের সব ম্যাচে এক নিয়ম বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত।
ফুটবলের ভবিষ্যৎ কি বদলে যাবে?
বর্তমানে এই নিয়ম শুধুমাত্র ২০২৬ FIFA World Cup-এর জন্য প্রযোজ্য। বিশ্বের বিভিন্ন লিগ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এটি বাধ্যতামূলক নয়।
তবে (FIFA World Cup 2026) বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রতিযোগিতাও একই পথে হাঁটতে পারে। সেক্ষেত্রে ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী ‘দুই অর্ধের খেলা’ ধারণা আরও বড় পরিবর্তনের মুখে পড়বে।
তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ফুটবলপ্রেমীরা এমন এক নতুন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে চলেছেন, যেখানে ৯০ মিনিটের ম্যাচকে প্রথমবারের মতো অনেকটাই ‘চার কোয়ার্টারের’ খেলা বলে মনে হবে।এই পরিবর্তন বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখবে কি না, বিশ্বকাপের মঞ্চে এই পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ কতটা সফল হয়, সেদিকেই এখন নজর ফুটবল বিশ্বের।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপের ম্যাচ কত নম্বর চ্যানেলে দেখানো হবে? রইল বিস্তারিত

