ইরানের বন্দরমুখী একটি কার্গো জাহাজে হামলা চালাল আমেরিকান সেনা (US Missile Attack)। অভিযোগ, সেই জাহাজটি ২০টিরও বেশি সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করেছে। তাই সেটিকে থামাতে ইঞ্জিন রুমে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে আমেরিকান সেনা। গাম্বিয়ায় নথিভুক্ত ‘লিয়ান স্টার’ নামের ওই জাহাজকে অচল করে দেওয়ার ঘটনায় ফের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর আলোচনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমশ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরানমুখী জাহাজে মার্কিন হামলা (US Missile Attack)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, গাম্বিয়ার পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ ‘লিয়ান স্টার’ ইরানের একটি বন্দরের উদ্দেশে এগোচ্ছিল। মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজটিকে পথ পরিবর্তনের জন্য বারবার নির্দেশ দিলেও সেটি তা মানেনি। (US Missile Attack) মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, মোট ২০টিরও বেশি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল।
(US Missile Attack) সব ধরনের সতর্কতা উপেক্ষা করার পর শেষ পর্যন্ত জাহাজটির ইঞ্জিন রুম লক্ষ্য করে একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। হামলায় জাহাজটি ডুবে যায়নি, তবে সম্পূর্ণরূপে অচল হয়ে পড়ে এবং বর্তমানে সেটি ওমান উপসাগরে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হামলার পর এখনও পর্যন্ত জাহাজটিতে কোনও বোর্ডিং অভিযান চালানো হয়নি।
এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া নৌ অবরোধের এটি ষষ্ঠ অভিযান
মার্কিন বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ এপ্রিল ইরানি বন্দরগুলির বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই নিয়ে ষষ্ঠবার কোনও জাহাজকে বাধা দেওয়া হলো। এ পর্যন্ত মোট ছয়টি জাহাজকে থামানো হয়েছে। যারমধ্যে একটি জাহাজকে যাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়া আরও ১১৬টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানের বন্দরগামী পথ থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের মতে, এই অবরোধের উদ্দেশ্য হলো ইরানের সমুদ্রপথে বাণিজ্য সীমিত করা এবং বিদেশি মুদ্রা আয়ের উৎসে চাপ সৃষ্টি করা।
আরও পড়ুন: হরমুজে অচলাবস্থা, তবু চলেছে ভারতীয় জাহাজ! সরবরাহ সচল রাখতে ‘গোপন কৌশল’ কেন্দ্রের
হরমুজ সংকট
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। তার জেরে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ দিয়েই বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সার পরিবহণ হয়। ফলে হরমুজে যে কোনও অস্থিরতা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সেটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে চাপ বাড়ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে চলমান অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন দেশে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুধু জ্বালানি নয়, কৃষিক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সার রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হল এই জলপথ। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ না হলেও আগের তুলনায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
যুদ্ধবিরতি বাড়ানো নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চিন্তাভাবনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার তাঁর উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বর্তমান যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচল পুনরায় শুরু হতে পারে। পাশাপাশি ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার পথও খুলবে। তবে শনিবার পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। অন্যদিকে, তেহরানও জানিয়েছে যে এখনও কোনও চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
আরও পড়ুন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালী নিয়ে বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা
জাহাজ চলাচলে নতুন টোল নিয়ে বিতর্ক
ইরান সম্প্রতি দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে হলে বিদেশি জাহাজগুলিকে অনুমতি নিতে হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে ২০ লক্ষ ডলার পর্যন্ত ট্রানজিট ফি দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের টোল আরোপ দীর্ঘদিনের ‘মুক্ত নৌ চলাচল’-এর নীতির পরিপন্থী। শনিবার ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড সতর্ক করে জানায়, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজ চলাচল করলে তার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এমনকি প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
তবে এই ইস্যুতে কিছুটা নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে কাতার। দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান জানান, নির্দিষ্ট ও সাময়িক পরিস্থিতিতে ট্রানজিট ফি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তাঁর মতে, যদি সেই অর্থ সত্যিই নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা আলোচনার বিষয় হতে পারে এবং ভবিষ্যতে হরমুজে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
(US Missile Attack) লিয়ান স্টারে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রমাণ করে যে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সংঘাত এখনও শেষ হয়নি। যুদ্ধবিরতি বহাল থাকলেও সমুদ্রপথে শক্তি প্রদর্শন, জাহাজ আটকানো এবং নতুন অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর পর্যায়ে রয়েছে।
ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, ‘লিয়ান স্টার’-এ মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার (US Missile Attack) পর ইরান সরাসরি বড় সামরিক সংঘর্ষে না গেলেও হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া করতে পারে। তেহরান ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছে যে তাদের অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজ চলাচল করলে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। ফলে আরও বেশি জাহাজ তল্লাশি, নতুন ট্রানজিট বিধিনিষেধ, অতিরিক্ত নৌ টহল বা মার্কিন অবরোধের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে ইরান। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চলা আলোচনায়ও তেহরান আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে বলে আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলের। তবে পরিস্থিতি যাতে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘর্ষে না গড়ায়, সেদিকেও নজর রাখছে উপসাগরীয় দেশগুলি।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাড়ানো ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়, তার উপরই নির্ভর করবে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের পরবর্তী গতিপথ।
আরও পড়ুন: শান্তি চুক্তি ‘প্রায় চূড়ান্ত’, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

