কলকাতার ব্রিগেডের শপথ মঞ্চে শনিবার শুধু সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা হয়নি, দেখা গেল এক অন্য ছবি। রাজনীতির কোলাহলের মাঝেও আচমকা থমকে গেল মুহূর্তটা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এগিয়ে গেলেন এক বৃদ্ধ মানুষের দিকে (Makhan Lal Sarkar)। তারপর তাঁকে জড়িয়ে ধরেন বুকে, ঝুঁকে পড়ে স্পর্শ করলেন তাঁর পা। ৯৭ বছরের সেই বৃদ্ধ মানুষটি মাখনলাল সরকার। মঞ্চে উপস্থিত বহু নেতামন্ত্রী, কর্মী-সমর্থকের চোখে তখন স্পষ্ট আবেগ।
বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের শপথের দিনে এই দৃশ্য যেন রাজনীতির বাইরেও অন্য এক বার্তা দিল। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও একজন প্রবীণ কর্মীর প্রতি সম্মান সেটাই যেন সামনে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। অনেকেই বলছেন, এই দৃশ্য শুধু একজন বৃদ্ধ নেতাকে সম্মান জানানো নয়, বরং বিজেপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে কুর্নিশ করা।
(Makhan Lal Sarkar) মাখনলাল সরকার তখন শান্তভাবে বসে ছিলেন। বয়সের ভার স্পষ্ট শরীরে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাঁর সামনে পৌঁছতেই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। মোদী তাঁর হাত ধরে কথা বলেন, তারপর প্রণাম করেন। সেই মুহূর্তে মাখনলাল সরকারের চোখেও ধরা পড়ে আবেগ। রাজনীতির মঞ্চে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না।
মাখনলাল সরকার কে?
মাখনলাল সরকার (Makhan Lal Sarkar) উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ির বাসিন্দা এবং বাংলায় বিজেপির প্রাচীনতম সংগঠকদের অন্যতম। তিনি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী। ১৯৫২ সালে কাশ্মীরে তেরঙ্গা উত্তোলনের আন্দোলনের সময়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি সেখানে যান। সেই আন্দোলনের সময় তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮০ সালে বিজেপি গঠনের পর উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং এবং পশ্চিম দিনাজপুরে সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব পান। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হাজার হাজার সদস্য সংগ্রহ করে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছিলেন তিনি। একসময় যখন বাংলায় বিজেপির অস্তিত্ব প্রায় ছিল না বললেই চলে, তখন ঘুরে ঘুরে সংগঠন দাঁড় করিয়েছিলেন মাখনলাল সরকার। ১৯৮১ সাল থেকে টানা সাত বছর জেলা সভাপতি ছিলেন। আজকের শক্তিশালী বিজেপির ভিত গড়ার পিছনে যাঁদের অবদান রয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম নাম তাঁর।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, মাখনলাল সরকার শুধু একজন সংগঠক ছিলেন না, তিনি ছিলেন দলের আদর্শের একনিষ্ঠ সৈনিক। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের শেষ যাত্রারও সঙ্গী ছিলেন তিনি। শমীক ভট্টাচার্য আরও জানান, কংগ্রেস আমলে দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার অপরাধে একবার দিল্লি পুলিশ তাঁকে (Makhan Lal Sarkar) গ্রেফতার করেছিল। আদালতে বিচারক তাঁকে ক্ষমা চাইতে বললেও তিনি রাজি হননি। বরং আদালতেই ফের সেই গান গেয়েছিলেন। পরে বিচারকই তাঁকে সম্মানের সঙ্গে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করে দেন।
এই ঘটনাগুলোই দেখায়, মাখনলাল সরকারের রাজনীতি ছিল শুধু দলীয় রাজনীতি নয় বরং বিশ্বাস আর আদর্শের লড়াই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই আচরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার মানুষ বরাবরই বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মানকে গুরুত্ব দেন। সেই আবেগকেই যেন স্পর্শ করলেন মোদী। একদিকে নতুন সরকার, নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথ, অন্যদিকে দলের পুরনো সৈনিককে সামনে এনে সম্মান জানানো — এই দুইয়ের মিলনে বিজেপি যেন স্পষ্ট বোঝাতে চাইল, তাদের রাজনীতি শুধু ক্ষমতার নয়, সংগঠনের শিকড়কেও তারা মনে রাখে।
মোদীর এই প্রণাম অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক আবেগঘন প্রতীক। যেখানে ক্ষমতার মঞ্চেও জায়গা থাকে ত্যাগ, সংগ্রাম আর পুরনো কর্মীদের সম্মানের। শপথের জৌলুসের মাঝেও দিনের সবচেয়ে বড় ছবি হয়ে রইল এক বৃদ্ধ মানুষের (Makhan Lal Sarkar) সম্মান আর দেশের প্রধানমন্ত্রীর নত হওয়া মাথা।











1 thought on “Makhan Lal Sarkar: শপথ মঞ্চে ৯৭ বছরের বৃদ্ধের পায়ে হাত মোদীর, কে তিনি ?”