দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ (US-Iran War) থামাতে ইরানের দেওয়া শান্তি প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, তেহরানের শর্তগুলি “Totally Unacceptable” বা “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য”। এর জেরে নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে, আমেরিকার অবস্থানের পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরানও। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নতুন করে মার্কিন হামলা হলে তারা পাল্টা আঘাত হানতে পিছপা হবে না। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে বিদেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের বিরুদ্ধেও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইসলামিক রিপাবলিক।
ট্রাম্পের কড়া বার্তা
(US-Iran War) নিজের সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম Truth Social-এ ট্রাম্প লেখেন, “আমি ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়া পড়েছি। আমার একেবারেই পছন্দ হয়নি। “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য”!
তবে তিনি প্রকাশ্যে ইরানের পাল্টা প্রস্তাবের নির্দিষ্ট কোনও বিবরণ দেননি। যদিও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইরান আলোচনার অংশ হিসেবে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একাংশ দিতে এবং বাকি অংশ তৃতীয় কোনও দেশে পাঠাতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু তার বিনিময়ে তেহরান কিছু গ্যারান্টি চেয়েছিল। ইরানের দাবি ছিল, ভবিষ্যতে যদি আমেরিকা আবার চুক্তি ভেঙে বেরিয়ে যায় বা আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই ইউরেনিয়াম ফেরত দিতে হবে। পাকিস্তানের মাধ্যমে এই বার্তা ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছয় বলে খবর। তবে ট্রাম্প সেই প্রস্তাবকে কার্যত আত্মসমর্পণের আগাম শর্ত হিসেবেই দেখছেন।
“কেউ কাছে এলেই উড়িয়ে দেব”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, ইরানের ইউরেনিয়াম ভাণ্ডারের উপর আমেরিকার কড়া নজরদারি রয়েছে। সাংবাদিক শ্যারিল অ্যাটকিসনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “যখন ইচ্ছা আমরা সেটা নিয়ে নেব। জায়গাটি সম্পূর্ণ নজরদারিতে রয়েছে। কেউ যদি সেখানে যায়, আমরা জানতে পারব এবং উড়িয়ে দেব।” তিনি আরও দাবি করেন, মার্কিন স্পেস ফোর্স এতটাই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে যে কেউ ওই এলাকায় ঢুকলে তার নাম, ঠিকানা, এমনকি পরিচয়পত্রের নম্বর পর্যন্ত জানা সম্ভব। এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, কূটনৈতিক আলোচনার মাঝেও ট্রাম্পের এ হেন ভাষা যে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক, তা স্পষ্ট।
ইরানের পাল্টা অবস্থান
ট্রাম্পের মন্তব্যের পরই কড়া প্রতিক্রিয়া দেয় ইরান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানানো হয়, আমেরিকার পাল্টা প্রস্তাব “আত্মসমর্পণের সমান” এবং তা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
ইরানের মূল দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে—
- মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
- বাজেয়াপ্ত ইরানি সম্পদ ফেরত
- যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ
- হরমুজ প্রণালীর উপর পূর্ণ ইরানি সার্বভৌমত্ব
(US-Iran War) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সোশ্যাল মিডিয়ায় স্পষ্ট বার্তা দেন। তিনি লেখেন, “আমরা কখনও শত্রুর সামনে মাথা নত করব না। আলোচনা মানেই আত্মসমর্পণ নয়।” এদিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে “শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী মোকাবিলার” নির্দেশ দিয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম দাবি করেছে।
নেতানিয়াহুর দাবি, “যুদ্ধ এখনও শেষ নয়”
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত সংঘাত শেষ হচ্ছে না। এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, “ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাতে হবে এবং তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলি ভেঙে ফেলতে হবে। ততক্ষণ যুদ্ধ শেষ নয়।” তিনি আরও দাবি করেন, ট্রাম্পও একই অবস্থানে রয়েছেন। যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে বারবার বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এই দ্বৈত অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। একদিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা, অন্যদিকে সামরিক হুমকি— দুইয়ের টানাপোড়েনে (US-Iran War) পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ
সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে। (US-Iran War) যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান সেখানে কার্যত নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইরান ইতিমধ্যেই ওই প্রণালী দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলির উপর টোল ব্যবস্থা চালু করেছে বলে খবর। কিন্তু আমেরিকার দাবি, আন্তর্জাতিক জলপথের উপর ইরানের এমন নিয়ন্ত্রণ “মেনে নেওয়া যায় না”। অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনীও ইরানের বন্দরগুলিকে ঘিরে নজরদারি বাড়িয়েছে। কিছু জাহাজের গতিপথ বদলে দেওয়া বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ব্রিটেন-ফ্রান্সের ভূমিকা
যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। লক্ষ্য, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্য ও তেল পরিবহণ স্বাভাবিক রাখা। এই সপ্তাহেই ৪০টিরও বেশি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানে সামরিক পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, ব্রিটেন বা ফ্রান্স যদি হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠায়, তাহলে “তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব” দেওয়া হবে। যদিও পরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, ফ্রান্স সরাসরি সামরিক মোতায়েনের কথা ভাবছে না। বরং ইরানের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিরাপত্তা মিশনের কথাই বিবেচনা করা হচ্ছে।
কী প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
- তেলের দাম আরও বাড়তে পারে
- জ্বালানির খরচ বৃদ্ধি পাবে
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ধাক্কা লাগতে পারে
- শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা দিতে পারে
- পশ্চিম এশিয়াজুড়ে নতুন সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে
সব মিলিয়ে,(US-Iran War) ট্রাম্পের কড়া অবস্থান ও ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যকে ফের এক অনিশ্চিত যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন নজর কূটনৈতিক আলোচনায় কোনও নতুন সমাধান বেরোয় কি না।
“শেষের পথে ইউক্রেন যুদ্ধ”, বিজয় দিবসের পর বড় বার্তা পুতিনের: US-Iran War: ‘টোটালি আনঅ্যাকসেপ্টেবল’! ইরানের শান্তি প্রস্তাব ওড়ালেন ট্রাম্প, ফের যুদ্ধের তীব্র আশঙ্কা











