ছোটবেলায় বাবা-মা কিংবা দাদু-ঠাকুমার মুখে অনেকেই শুনেছেন—ভেজা চুল নিয়ে ঘুমোলে নাকি সর্দি-কাশি, জ্বর কিংবা ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। সেই ধারণা থেকেই অনেকে রাতে চুল ভালো করে না শুকিয়ে ঘুমোতে যান না। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলছে? সত্যিই কি ভেজা চুলের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকে?
Sleeping with Wet Hair: ভেজা চুলে ঘুমোলেই কি সর্দি-জ্বর হয়?
চিকিৎসকদের মতে, ভেজা চুল নিয়ে ঘুমোলেই সরাসরি সর্দি বা ফ্লু হয় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভেজা চুল নিয়ে নিয়মিত ঘুমানো চুল বা মাথার ত্বকের জন্য একেবারেই ক্ষতিকর নয়।
সাধারণ সর্দি বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুখ মূলত ভাইরাসের কারণে হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির ড্রপলেট, কাছাকাছি সংস্পর্শ কিংবা দূষিত কোনও জিনিসের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ, শুধু চুল ভেজা থাকার কারণে শরীরে ভাইরাস ঢুকে সর্দি বা ফ্লু হয়ে যাবে—এমন কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাই ‘ভেজা চুলে ঘুমোলেই ঠান্ডা লেগে যাবে’—এই প্রচলিত ধারণাটি আসলে একটি মিথ।
তাহলে ভেজা চুল নিয়ে ঘুমানো ভালো নয় কেন?
সর্দি-জ্বর না হলেও ভেজা চুল নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়ে থাকার কিছু অসুবিধা রয়েছে। মাথার ত্বক অনেকক্ষণ ভেজা থাকলে সেখানে আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হয়। এই পরিবেশে মাথার ত্বকে থাকা কিছু ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়তে পারে।বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই খুশকি, সেবোরিক ডার্মাটাইটিস বা মাথার ত্বকে ছত্রাকের সংক্রমণের প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
এক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে—
- মাথার ত্বকে চুলকানি
- অতিরিক্ত খুশকি
- লালচে ভাব
- জ্বালা বা অস্বস্তি
তবে সুস্থ মাথার ত্বকের মানুষের ক্ষেত্রে এক-দু’বার ভেজা চুল নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেই বড় কোনও সমস্যা হবে, এমনটা নয়। সমস্যা বেশি হতে পারে যদি এটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়।
ভেজা অবস্থায় চুল কেন বেশি ভেঙে যায়?
চুল ভেজা অবস্থায় তুলনামূলকভাবে বেশি দুর্বল ও ভঙ্গুর থাকে। চুলের গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত আর্দ্রতার কারণে চুলের গঠন কিছুটা পরিবর্তিত হয় এবং তখন চুলে ঘর্ষণ বেশি হলে সহজেই ক্ষতি হতে পারে।
ঘুমের সময় বালিশের সঙ্গে মাথা ঘষা খাওয়ার ফলে ভেজা চুল ভেঙে যাওয়া, ডগা ফেটে যাওয়া, চুল জট পাকানো, অতিরিক্ত ফ্রিজি হয়ে যাওয়া বা চুলের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত ভেজা চুল নিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে চুলকে রুক্ষ ও দুর্বল দেখাতে পারে। (Sleeping with Wet Hair)
বালিশেও জমতে পারে আর্দ্রতা
ভেজা চুলের জল বালিশ ও বালিশের কভারে লেগে থাকতে পারে। নিয়মিত বালিশের কভার পরিষ্কার না করলে সেখানে আর্দ্রতার পাশাপাশি ধুলো ও অন্যান্য অণুজীব জমতে পারে।এর ফলে যাঁদের অ্যালার্জি বা ত্বক সংবেদনশীল, তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যা বা অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই শুধু চুল নয়, বালিশের কভারও নিয়মিত পরিষ্কার ও শুকনো রাখা জরুরি।
প্রতিদিন ড্রাগন ফল খাচ্ছেন? অজান্তেই বিপদ ডেকে আনছেন না তো?
ভেজা চুলে ঘুমোলে কি মাথাব্যথা বা ঘাড়ে ব্যথা হয়?
অনেকেই ভেজা চুল নিয়ে ঘুমানোর পর সকালে মাথাব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তবে ভেজা চুল সরাসরি মাথাব্যথার কারণ—এমন শক্ত প্রমাণ এখনও নেই। তবে দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডা ও ভেজা মাথার ত্বক কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। একইভাবে ভেজা চুলের কারণে বালিশ ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেলে ঘুম নষ্ট হতে পারে।
ঘুমের আগে চুল কীভাবে শুকোবেন?
ভেজা চুল নিয়ে ঘুমানোর পরিবর্তে ঘুমের আগে চুল যতটা সম্ভব শুকিয়ে নেওয়াই ভালো। সময় কম থাকলেও কয়েকটি সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়।
১. হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করুন: খুব বেশি গরম না করে কম বা মাঝারি তাপমাত্রায় চুল শুকিয়ে নিতে পারেন।
২. তোয়ালে দিয়ে আলতো করে জল মুছুন: চুল জোরে ঘষে শুকোবেন না। এতে চুল ভেঙে যেতে পারে।
৩. ভেজা চুল শক্ত করে বাঁধবেন না: চুল ভেজা অবস্থায় শক্ত করে বাঁধলে চুলে টান পড়তে পারে। সম্ভব হলে চুল খোলা রাখুন।
৪. পরিষ্কার বালিশের কভার ব্যবহার করুন: নিয়মিত বালিশের কভার ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে ব্যবহার করুন।
৫. সিল্ক বা সাটিনের বালিশের কভার ব্যবহার করতে পারেন: এগুলিতে তুলোর তুলনায় ঘর্ষণ কম হওয়ায় চুলের জট ও ভাঙা কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে। (Sleeping with Wet Hair)
তাই চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ভেজা চুল নিয়ে ঘুমোলেই সর্দি-জ্বর হবে—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কারণ সর্দি বা ফ্লুর জন্য ভাইরাস দায়ী, ভেজা চুল নয়। তবে দীর্ঘক্ষণ ভেজা চুল নিয়ে ঘুমালে মাথার ত্বকে আর্দ্রতা বাড়তে পারে, চুলের ক্ষতি হতে পারে এবং ঘুমের আরামও কমতে পারে।তাই অসুস্থ হওয়ার ভয় থেকে নয়, বরং চুল ও মাথার ত্বকের যত্নের জন্যই ঘুমানোর আগে চুল ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া উচিত।












