নিজেদের গ্রামকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কোনও বড় বড় প্রচার বা সরকারি অভিযানের অপেক্ষা করেন না এই গ্রামের বাসিন্দারা। বরং প্রতিদিন নিজেরাই রাস্তা পরিষ্কার করেন। দিনে তিনবার ঝাঁট দেওয়া হয় গ্রামের রাস্তায়। যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক ফেলা নিষিদ্ধ। কেউ নিয়ম ভেঙে রাস্তায় আবর্জনা ফেললে গুনতে হয় জরিমানা। শুধু গ্রামের বাসিন্দারাই নন, পর্যটক বা বাইরের কেউ গ্রামে এসে নোংরা করলেও তাঁর জন্য রয়েছে একই নিয়ম। ওডিশার ময়ূরভঞ্জ জেলার আদিবাসী অধ্যুষিত বাবোজোলা গ্রামের পরিচ্ছন্নতার ছবি এভাবেই তৈরি করেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্রামের মানুষের এই উদ্যোগ আজ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
Odisha Clean Village: এক শিক্ষকের উদ্যোগে বদলে গেল গ্রামের ছবি
বাবোজোলার পরিচ্ছন্নতার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় ১৫ বছর আগে। গ্রামেরই এক স্কুলশিক্ষক মধুসূদন মারান্ডি চেয়েছিলেন, তাঁর গ্রাম পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে অন্যদের কাছে উদাহরণ হয়ে উঠুক। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় উদ্যোগ। প্রথমে একজনের প্রচেষ্টা হলেও ধীরে ধীরে তাতে সামিল হন গ্রামের অন্যান্য বাসিন্দারাও।
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে গ্রামবাসীরা মিলে একটি ক্লাব তৈরি করেন। গ্রামের রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সবকিছুর দায়িত্ব ভাগ করে নেন তাঁরা। নিজেদের মধ্যে টাকা সংগ্রহ করে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয় ডাস্টবিন, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং সৌরবিদ্যুতের প্যানেল।
শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, গ্রামের পরিবেশ ভালো রাখতে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু কড়া নিয়মও-
- যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক ফেলা নিষিদ্ধ।
- প্রকাশ্যে ধূমপান, থুতু ফেলা এবং তামাক খাওয়া নিষিদ্ধ।
- রাস্তায় আবর্জনা ফেললে জরিমানা দিতে হয়। এই নিয়ম পর্যটক এবং বাইরের লোকেদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
দিনে তিনবার ঝাঁট, বর্জ্য থেকে তৈরি হয় সার
বাবোজোলায় পরিচ্ছন্নতা কোনও বিশেষ দিন বা বার্ষিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় গ্রামের রাস্তায় ঝাঁট দেন বাসিন্দারা। ফলে রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার কাজ এখানে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
আবর্জনা যত্রতত্র না ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় জমা করা হয়। বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করা এবং জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট বা জৈব সার তৈরির ব্যবস্থাও রয়েছে। অর্থাৎ, আবর্জনা ফেলার পর তা সরিয়ে দেওয়ার বদলে শুরু থেকেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেন গ্রামের মানুষ। (Odisha Clean Village)
ভুল করে টাকা কাটার খেসারত, ব্যাঙ্কের থেকে ২.২৯ লাখ পেলেন দম্পতি
প্রায় ৭০টি পরিবার নিয়ে গড়ে ওঠা এই গ্রামের পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক সৌন্দর্যও। অনেক বাড়ির ছাউনি খড়ের। বাড়ির দেওয়ালে ফুল, পাতা, পশুপাখি এবং নানা ঐতিহ্যবাহী নকশা আঁকা থাকে। স্থানীয়ভাবে এই দেওয়ালচিত্র পরিচিত ‘ভিট পোটাও’ নামে। গ্রামের মহিলারাই নিজেদের হাতে এই ছবি আঁকেন। রং তৈরিতে ব্যবহার করা হয় নদীর পাড়ের মাটি, পাথর, গাছের ছাল এবং বিভিন্ন ফুলের মতো প্রাকৃতিক উপাদান।
বাবোজোলার বিশেষত্ব এখানেই। পরিচ্ছন্নতা এখানে শুধু রাস্তা ঝাঁট দেওয়া বা আবর্জনা সরানোর মধ্যে আটকে নেই। প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকা এবং গ্রামের পরিবেশকে সুন্দর রাখাও তাঁদের জীবনযাপনের অঙ্গ।
দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে যখন নানা প্রচার ও কর্মসূচি চালিয়েও রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা যাচ্ছে না। সেখানে বাবোজোলা দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষের অভ্যাস এবং সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কোনও ব্যবস্থাই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। একজন শিক্ষকের শুরু করা ভাবনা আজ গোটা গ্রামের দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। আর সেই অভ্যাসই গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ছবির মতো সাজিয়ে রেখেছে বাবোজোলাকে।












