হোটেল ঘরে কাটানো একান্ত মুহূর্ত যে ক্যামেরাবন্দি হয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তা কল্পনাও করতে পারেননি তিনি। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটেছে চিনের এক যুবকের সঙ্গে। একটি পর্ণ সাইটে ঢুকে হঠাৎই নিজের ভিডিয়ো দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান তিনি। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সেই ঘটনাই ফের সামনে এনে দিয়েছে চিনের ভয়াবহ ‘গোপন ক্যামেরা পর্নোগ্রাফি’ চক্রকে (China spy cam empire)। জানা গিয়েছে, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে ওই যুবক তাঁর বান্ধবীর সঙ্গে শেনঝেনের একটি হোটেলে গিয়েছিলেন। অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটান তাঁরা। সেই সময় রুমে বসানো গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে তাঁদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিয়ো রেকর্ড করা হয়। পরে সেই ভিডিয়োই আপলোড করা হয় পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইটে।

ঘটনার পর নতুন করে তদন্ত শুরু হয় চিনের গোপন ক্যামেরা নির্ভর পর্নোগ্রাফি নিয়ে। বিবিসি ওয়ার্ল্ড (BBC) সার্ভিসের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। হোটেল রুমগুলিতে লুকিয়ে রাখা ক্যামেরার মাধ্যমে গেস্টদের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত সরাসরি লাইভস্ট্রিম করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পরে ভিডিয়োগুলি সাবস্ক্রিপশনের ভিত্তিতে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চক্রে রয়েছে ক্যামেরা বসানো টেকনিশিয়ান, ক্যামেরার মালিক, মধ্যস্থতাকারী এজেন্ট এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারীরা। নিষিদ্ধ মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামের মাধ্যমে এই ভিডিয়োগুলির প্রচার চালানো হচ্ছিল। কয়েকটা গ্রুপ একসঙ্গে শতাধিক হোটেল রুমের ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করত এবং গ্রাহকদের থেকে মাসে প্রায় ৪৫০ ইউয়ান করে নেওয়া হতো।
গ্রাহকেরা বিভিন্ন লাইভ ফিড বেছে নেওয়ার সুযোগ পেতেন। হোটেল রুমে ঢুকে কার্ড ঢোকালেই ক্যামেরা চালু হয়ে যেত।
ওয়েবসাইটগুলিতে ভিডিয়ো রিওয়াইন্ড করা, ডাউনলোড করা এবং চ্যাট রুমে কথা বলার ব্যবস্থাও ছিল। তদন্তে সাত মাসে অন্তত ৫৪টি গোপন ক্যামেরার হদিশ মিলেছে। যার মধ্যে অর্ধেক ক্যামেরা তখনও পুরোদমে সক্রিয় ছিল। হোটেলগুলির বুকিং-এর হারের ভিত্তিতে তদন্তকারীদের অনুমান, হাজার হাজার অতিথি অজান্তেই নজরদারির শিকার হয়েছেন।
তদন্তকারীরা জানান, অত্যন্ত ছোট আকারের ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলি বসানো হয় হোটেল ঘরের বিভিন্ন কোনায়। এই ক্যামেরাগুলি সরাসরি বিদ্যুতের সঙ্গে যুক্ত থাকত। এজেন্টরা ক্যামেরার মালিক ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। এই কাজ শুরু হয় ২০১৭ সাল থেকে। এই পুরো কাজে হাজারেরেও বেশি ভিডিয়ো ক্লিপ পাওয়া গিয়েছে।
চিন সরকার ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে হোটেলগুলিকে নিয়মিত গোপন ক্যামেরা পরীক্ষার নির্দেশ দেয়। তদন্তকারীরা গত ১৮ মাসে ছ’টি আলাদা প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার নতুন ভিডিয়ো আপলোডের হদিশ পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ভিডিয়োর চাহিদাই এই বেআইনি বাজারকে টিকিয়ে রেখেছে। পাশাপাশি, বাজারে পাওয়া বহু ক্যামেরা ডিটেক্টর পেশাদারভাবে লুকানো ক্যামেরা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ঘটনায় চিনে হোটেল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের তরফে এই চক্রের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও, গোপন ক্যামেরা-নির্ভর এই অপরাধচক্র নির্মূল করা বড় চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।












