দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শেষে গাজিয়াবাদের হরিশ রানার পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুর (প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া) আবেদন মঞ্জুর ভারতের সুপ্রিম কোর্টের। কিন্তু কেন এমন রায় ?
৩১ বছর বয়সি হরিশ রানা (Harish Rana) প্রায় ১৩ বছর ধরে প্রায় অচেতন অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছিলেন। ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট চণ্ডীগড়ে পিজি হিসেবে থাকাকালীন চারতলা বারান্দা থেকে পড়ে যান তিনি। দুর্ঘটনায় তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং তিনি সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। এরপর থেকেই স্থায়ীভাবে অচেতন অবস্থায় ছিলেন। কথা বলা, দেখা, শোনা বা কাউকে চিনতে পারা- কিছুই তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। বেঁচে থাকার লড়াই চালাতে চিকিৎসা ব্যবস্থা উপরে নির্ভরশীল ছিলেন।
বছরের পর বছর ধরে এই পরিস্থিতিতে ছেলেকে দেখে ভেঙে পড়েছিলেন বাবা–মা। শেষ পর্যন্ত তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আবেদন জানান, ছেলেকে সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার দেওয়া হয়। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এত দীর্ঘ সময় ধরে এই অবস্থায় বেঁচে থাকা আসলে জীবনের চেয়ে যন্ত্রণাই বেশি। সেই কারণেই তাঁরা সুপ্রিম কোর্টে পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুর অনুমতি চান।
এই মামলার শুনানি হয় সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি জে বি পারদেওয়ালা এবং কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চে। আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করে পরিবারের মতামত, চিকিৎসকদের রিপোর্ট এবং সরকারের বক্তব্য সব দিকই খতিয়ে দেখে। আদালতে জানানো হয়, হরিশ রানার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর এবং তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কার্যত নেই।
অবশেষে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে সুপ্রিম কোর্ট হরিশ রানার ক্ষেত্রে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেয়। আদালত নির্দেশ দেয়, চিকিৎসা–সংক্রান্ত সমস্ত প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাঁকে দিল্লির এইমস (AIIMS) এ ভর্তি করিয়ে জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থাগুলি ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
ভারতের আইনি ইতিহাসে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এটিই দেশের প্রথম এমন ঘটনা যেখানে আদালতের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া (Euthanasia) কার্যকর করার অনুমতি দেওয়া হল। ভারতে সক্রিয় ইচ্ছামৃত্যু এখনও আইনি স্বীকৃতি পায়নি। তবে আদালত আগেই বলেছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বন্ধ করে “সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার” দেওয়া যেতে পারে। হরিশ রানার মামলাটিও সেরকমই একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
বাস্তব জীবনের এই ঘটনা অনেককেই মনে করিয়ে দিচ্ছে সঞ্জয় লীলা বানসালির সেই বিখ্যাত ছবি ‘গুজারিশ’ এর কথা। যেখানে হরিশের মতোই এক প্রতিবন্ধীর ভূমিকায় ছিলেন ঋত্বিক। তিনিও আদালতের কাছে ইচ্ছামৃত্যুর জন্য আবেদন করেছিলেন। সেই ছবিতে একটাই প্রশ্ন উঠে এসেছিল মানুষ কি সম্মানের সঙ্গে নিজের মৃত্যুর অধিকার পেতে পারে না? হরিশ রানার (Harish Rana) মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় সেই প্রশ্নের এক ঐতিহাসিক উত্তর হয়ে রইল।











