পাঁচ দিনের উৎসব শেষে উমা ফিরছেন কৈলাসে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মর্ত্যে উমার বিদায়ের খবর নীলকণ্ঠ পাখিই পৌঁছে দেয় মহাদেবের কাছে। তাই বিজয়া দশমীতে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রীতি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার নানা বনেদি বাড়ি ও রাজপরিবারের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু সেই চেনা ছবি এখন ক্রমশ ফিকে হচ্ছে। বাংলার আকাশে কমছে নীলকণ্ঠ পাখি। একসময় পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় শরৎ এলেই এই পাখির দেখা মিলত। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল। ফলে বদলাতে হচ্ছে দশমীর পুরনো রীতিও। একদিকে পাখির সংখ্যা কমে যাওয়া, অন্যদিকে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন— দুইয়ের চাপে নীলকণ্ঠ ওড়ানোর প্রথা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে বহু বনেদি পরিবার।
Nilkantha Birds: কেন কমছে নীলকণ্ঠের সংখ্যা?
পক্ষী গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলায় নীলকণ্ঠের সংখ্যা কমছে। তাঁদের অনুমান, এই সময়ে পাখির সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছে। তবে ঠিক কতটা কমেছে, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনও হাতে নেই। ‘স্টেট অফ ইন্ডিয়াস বার্ডস ২০২৩’-এ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে নানা তথ্য ও গবেষণা উঠে এলেও নীলকণ্ঠের বিপন্নতা নিয়ে পর্যাপ্ত অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টের অভাব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীলকণ্ঠের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ খাদ্যসংকট। সাধারণত ধানের জমি কিংবা বিদ্যুতের তারের উপরে বসে থাকতে দেখা যায় এই পাখিকে। পোকামাকড় ও বিভিন্ন কীটপতঙ্গই এদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু চাষের জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কমছে পোকামাকড়ের সংখ্যা। ফলে নীলকন্ঠের খাবারের অভাব দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ায় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ব্যাহত হচ্ছে।
সৎ মায়ের গায়ে আগুন ছেলের, মৃত্যু ৪০ বছরের মহিলার
আবাসস্থল হারানোও বড় কারণ
খাদ্যসংকটের পাশাপাশি নীলকণ্ঠের অস্তিত্বের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠেছে নগরায়ণ। বাড়িঘর, রাস্তা ও অন্যান্য নির্মাণের জন্য নির্বিচারে কাটা হচ্ছে বড় বড় গাছ। এর ফলে পাখিদের আশ্রয় ও বাসা বাঁধার উপযুক্ত জায়গা ক্রমশ কমছে। পরিবর্তিত হচ্ছে তাদের চেনা পরিবেশও।
এ ছাড়াও মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত বিকিরণ নীলকণ্ঠের প্রজননক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন কেউ। যদিও এই দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত গবেষণালব্ধ প্রমাণের বিষয়টি আলাদা করে যাচাই করা জরুরি।
শুধু নীলকণ্ঠ নয়, বিপদে আরও বহু পাখি
তবে বাংলায় পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার ছবিটা শুধু নীলকণ্ঠেই (Nilkantha Birds) আটকে নেই। চড়ুই, ধনেশ, মদনটাকের মতো একাধিক প্রজাতির পাখির সংখ্যাও কমছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন পক্ষীপ্রেমী ও গবেষকেরা। পরিবেশের পরিবর্তন, খাদ্যের অভাব এবং উপযুক্ত বাসস্থানের সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাই একসময় দশমীর নীলকণ্ঠ ওড়ানোর রীতি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। শোভাবাজার রাজবাড়ির মতো বনেদি বাড়িগুলোকে প্রতীকী পাখি দিয়েই সারতে হচ্ছে সেই পরিচিত লোকাচার।








