ভারতীয় ক্রীড়াজগতে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। প্রয়াত হলেন স্বপন সাধন বোস বা Tutu Bose, যিনি ক্রীড়ামহলে ‘টুটুবাবু’ নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রাক্তন মোহনবাগান সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তাঁর প্রয়াণে শুধু মোহনবাগান নয়, গোটা ভারতীয় ক্রীড়াপ্রশাসন এক অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্বকে হারাল।
গত কয়েকদিন ধরেই শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন টুটুবাবু। সোমবার সন্ধ্যায় হঠাৎ তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুরু থেকেই তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। তাঁর চিকিৎসার জন্য বিশেষ মেডিক্যাল টিমও গঠন করা হয়। অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে ক্রীড়ামহল ও রাজনৈতিক মহলে। হাসপাতালে পৌঁছে যান কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী নিশিথ প্রামাণিক। তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন কল্যাণ চৌবেও। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তবে শেষরক্ষা হয়নি। মঙ্গলবার রাতে দ্বিতীয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর গভীর রাতে প্রয়াত হন টুটুবাবু।
মোহনবাগান ক্লাবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আত্মিক। ১৯৯১ সাল থেকে প্রায় তিন দশক তিনি সরাসরি ক্লাব প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে সবুজ-মেরুন শিবির বহু কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি সংকটেই সামনে থেকে দায়িত্ব সামলেছেন টুটুবাবু। কখনও প্রশাসনিক দক্ষতায়, কখনও আর্থিক সহায়তায়, আবার কখনও মানসিক সাহস জুগিয়ে ক্লাবকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তিনি।
ময়দানের মানুষদের কাছে টুটুবাবু শুধু একজন প্রশাসক ছিলেন না, ছিলেন অভিভাবক। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের চিরন্তন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও তিনি ছিলেন অজাতশত্রু। সব ক্লাবের সমর্থকদের কাছেই তিনি ছিলেন সমান শ্রদ্ধার পাত্র। তাঁর ব্যবহার, সহজাত সৌজন্য ও ক্লাবের প্রতি নিবেদন তাঁকে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোহনবাগান যখন আধুনিক ফুটবলের পথে হাঁটতে শুরু করে, তখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন টুটুবাবু। শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েঙ্কার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্লাবের ফুটবল বিভাগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বিদেশি ফুটবলার আনা, আধুনিক পরিকাঠামো তৈরি, ক্লাব পরিচালনায় নতুন চিন্তাভাবনা— সব ক্ষেত্রেই তাঁর প্রভাব ছিল স্পষ্ট।
গত বছর তাঁকে ‘মোহনবাগান রত্ন’ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। যদিও ময়দানের অনেকের মতে, এই সম্মান তাঁর আরও আগেই প্রাপ্য ছিল। কারণ তিনি শুধু প্রশাসক ছিলেন না, ছিলেন মোহনবাগানের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
আজ টুটুবাবু নেই। কিন্তু তাঁর অবদান, তাঁর নেতৃত্ব এবং মোহনবাগানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা চিরকাল সবুজ-মেরুন ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে কলকাতা ময়দান হারাল এক কিংবদন্তি অভিভাবককে, যার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।










