কুশল চক্রবর্তী
ভারতবাসীর জীবন যেমন অনেক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে স্বাধীনতার ৭৫ বছরের অধিক অতিবাহিত দিনগুলোতে। তেমনই স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন এসেছে ১৯৫২ সাল থেকে ভারতে শুরু হওয়া নানা লোকসভা বা বিধানসভার গনতান্ত্রিক নির্বাচনে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে নির্বাচনে এসেছে নানা অভিনবত্বের ছোঁয়া (Exit Poll)।
১৯৮০ সালের পর থেকে যে কোনও নির্বাচন শুরুর আগে দেখা যায় নানা রকম সমীক্ষা। প্রথমে ছিল প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষা। পরে ১৯৯৬ সালের পর থেকে দেখা দেয় নির্বাচনের পর বুথ ফেরত সমীক্ষা, যা কিনা ভোট গোনার আগেই সম্ভাব্য ভোটের ফলাফল সম্পর্কে কিছু সঠিক আভাস দেয়। কিছুদিনের মধ্যেই এই বুথ ফেরত সমীক্ষা বা Exit Poll বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তার সাফল্যের জন্য। কিন্তু যত দিন যেতে থাকে, আপামর জনগণের মধ্যে এই বুথ ফেরত সমীক্ষা নিয়ে দেখা দেয় নানা বিভ্রান্তি। অভিযোগ ওঠে, এই বিভ্রান্তির প্রথম কারণ বুথ ফেরত সমীক্ষার চরম ব্যর্থতাই শুধু নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনে করা হতে থাকে এই বুথ ফেরত সমীক্ষায় যেন অদৃশ্য কিছু “সিলভার টনিকের” হাত আছে।
‘২০২৬-এ ২২৬টা আসন পাব’, বিজেপির বিরুদ্ধে এক্সিট পোলে কারচুপির অভিযোগ মমতার
ভারতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষা বা বুথ ফেরত সমীক্ষার মতো নব চিন্তার প্রবেশ ঘটানোর ব্যাপারে পথপ্রদর্শক হিসাবে মাননীয় প্রণয় রায়ের কথা বললে হয়ত অত্যুক্তি করা হবে না। প্রথমদিকে বৈদ্যুতিন মাধ্যমের উৎসাহজনিত কারণে, প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষা বা বুথ ফেরত সমীক্ষা মূলত টিভি চ্যানেলগুলো নিজেরাই করলেও, পরে তারা বিভিন্ন সংস্থাকে এই কাজে নিয়েজিত করতে থাকে। তখন থেকেই দেখা যায় বুথ ফেরত সমীক্ষার বেশ গন্ডগোল।
একের পর নির্বাচনে দেখা যায় ৬০ শতাংশ বুথ ফেরত সমীক্ষায় অবাক করা ফলাফল। ২০১৯ লোকসভা কথাই ধয়ার যাক, ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া সংস্থা যে লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বুথ ফেরত সমীক্ষা মারফত ঘোষণা করে, তা প্রায় মিলে যায়। তারা বলেছিল NDA জোট ৩৩৯-৩৬৫ সিট পাবে আর UPA জোট ৭৭-১০৮টি আসন পাবে। প্রকৃত ফলাফলে দেখা যায় NDA জোট ৩৫৩টি আসন পায় আর UPA জোট পায় ৮২টি আসন।

সে বার বুথ ফেরত সমীক্ষায় টাইমস নাও, রিপাবলিক-জন কি বাত, নিউজ১৮-আইপিএসওএস কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু সে বার এই ধরনের সংস্থাগুলোর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের বুথ ফেরত সমীক্ষায় উঠে এসেছিল বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ২১৬টি আসন আর বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন।
আসা যাক ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের কথায়। সে বার বুথ ফেরত সমীক্ষার বেশীরভাগ সংস্থাই NDA জোটকে ৩৭০টির বেশি আসন আর UPA জোটকে ১৭০টির মতো আসন পাওয়ার কথা বলেছিল। তার মধ্যে আবার ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ায় তো NDA জোটকে ৪০০ আসন পার করিয়ে দিয়েছিল। বাস্তবে NDA জোট পেয়েছিল ২৯৩টি আসন আর UPA জোট পেয়েছিল ২৩৪টি আসন।
হিন্দু ভোট একজোট, মুসলিম ভোটের ৮% বিজেপির দিকে’, বাংলায় সরকার গঠনের দাবি শুভেন্দু অধিকারীর
এ বারের, মানে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বুথ ফেরত সমীক্ষা যা কি না ভারতের সব প্রথিতযশা টিভি চ্যানেল ফলাও করে দেখিয়েছে, তার গড় করলে দাঁড়াচ্ছে, বিজেপি এই নির্বাচনে পেতে যাচ্ছে ১৫২টি আসন আর তৃণমূল কংগ্রেস পেতে যাচ্ছে ১৩৮ টি আসন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, গত লোকসভা নির্বাচনের পরিশেষ ফলাফল ঘোষণার পর লজ্জার সন্মুখীন হয়ে অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার অন্যতম কর্ণধার মাননীয় প্রদীপ গুপ্তা এবার পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে কোনও বুথ সমীক্ষা করতে রাজিই হননি।
অন্য দিকে কলকাতার একটি ইউটিউব চ্যানেল ২০২১ সালে বলেছিল তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভায় পাবে ১৮৪টি আসন আর বিজেপি পাবে ৭২টি, বাস্তবে কী হয়েছিল তা তো আগেই বলেছি। এবারও সেই চ্যানেলটি ঘোষণা করেছে, তৃণমূল কংগ্রেস ২০২৬-র নির্বাচনে বিধানসভাতে পেতে যাচ্ছে ২২০টির বেশী আসন আর বিজেপের ঝুলিতে হয়ত যাবে ৫২ থেকে ৫৮ টি আসন। কলকাতার আরেকটি চানেল টিভি১৮-ও কিন্তু তাদের সমীক্ষায় ১৬৬টি আসন তৃণমূল কংগ্রেস পাবে বলে আশা প্রকাশ করেছে তাদের বুথ ফেরত সমীক্ষায়।
বুথ ফেরত সমীক্ষা হুবহু মিলে যাবে, এমন কথা যারা এই কাজ করেন তাঁরাও বলেন না। কিন্তু আমাদের প্রখ্যাত টিভি চ্যানেলগুলোর দিকে তাকালে একটা কথা দেখা যায় যে, বিগত ৭ বা ৮ বছরে, কেন্দ্রে যে দলের সরকার থাকে, সেই দলের স্বপক্ষে যদি বুথ ফেরত সমীক্ষা থাকে, তবে তারা সেই সব সমীক্ষা প্রচারে অনেক বেশী আগ্রহ দেখায়।










1 thought on “Exit Poll 2026: বুথ ফেরত সমীক্ষার উপর কতটা নির্ভর করা যায়?”