ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোশাক ও আনুষ্ঠানিক রীতিনীতিতে বড়সড় পরিবর্তন আনল কেন্দ্রীয় সরকার। প্রায় আট বছর পর প্রকাশিত হয়েছে নতুন ‘আর্মি ইউনিফর্মস-২০২৬’ ম্যানুয়াল, (Army New Dress Code) যেখানে সেনা সদস্যদের পোশাক, পরিচ্ছদ, ব্যক্তিগত সাজসজ্জা এবং আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের নিয়মাবলিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করা হয়েছে। ১৭৪ পাতার এই নতুন নির্দেশিকায় ঔপনিবেশিক যুগের একাধিক প্রথা ও পরিভাষা বাদ দিয়ে ভারতীয় ভাবধারাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সেনার দাবি, দেশের পরিবর্তিত পরিচয় ও আধুনিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। একই সঙ্গে বাহিনীর মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও ঐতিহ্যও বজায় রাখা হয়েছে।
(Army New Dress Code) নতুন ইউনিফর্মে কী কী পরিবর্তন?
প্রথমবার অনুমোদন পেল ‘বান্দি জ্যাকেট’
আগে সেনা অফিসারদের আনুষ্ঠানিক পোশাকে নির্দিষ্ট ধরনের ব্লেজার বা কোট ব্যবহারের নিয়ম ছিল। নতুন ম্যানুয়ালে প্রথমবারের জন্য ক্লোজড-নেক বান্দি জ্যাকেট পরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়ম:
- ফুল স্লিভ শার্টের উপর বান্দি জ্যাকেট পরা যাবে।
- নেক হুক থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে।
- রং হতে হবে সংযত ও একরঙা।
- সঙ্গে মিলিয়ে ফর্মাল ট্রাউজার ও বন্ধ জুতো পরতে হবে।
বিদায় নিচ্ছে আনুষ্ঠানিক ‘পাউচ বেল্ট’
এতদিন মেস ড্রেস নম্বর ৫ এবং মেস ড্রেস নম্বর ৬ -এর সঙ্গে পাউচ বেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক ছিল। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, নৈশভোজ বা সরকারি সংবর্ধনার মতো অনুষ্ঠানে এই বেল্ট সেনা পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
নতুন নিয়ম:
- সাধারণ আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে আর পাউচ বেল্ট ব্যবহার করা হবে না।
- তবে কিছু ঐতিহ্যবাহী রেজিমেন্ট নিজেদের বিশেষ অনুষ্ঠানে এটি ব্যবহার করতে পারবে।
প্যারেডে তলোয়ার বহন আর বাধ্যতামূলক নয়
ঔপনিবেশিক আমল থেকে প্রচলিত একটি রীতি ছিল প্যারেডে রিভিউয়িং অফিসারের হাতে আনুষ্ঠানিক তলোয়ার থাকা।
পুরনো নিয়ম:
- পরিদর্শনকারী অফিসারকে তলোয়ার বহন করতে হত।
নতুন নিয়ম:
- তলোয়ার বহন সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক করা হয়েছে।
- প্রয়োজন মনে করলে ব্যবহার করা যাবে, বাধ্যতামূলক নয়।
নতুন শীতকালীন পোশাক ‘ড্রেস ৩বি’
(Army New Dress Code) সেনার সব স্তরের সদস্যদের জন্য নতুন শীতকালীন পোশাক চালু করা হয়েছে।
ড্রেস ৩বি-তে থাকবে:
- অ্যাঙ্গোলা শার্ট
- ব্যাটল জ্যাকেট
- বেরেট ক্যাপ
এটি শীতকালীন পরিবেশে আরাম ও কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।

ব্যক্তিগত পরিচ্ছদ ও গ্রুমিংয়ে কড়াকড়ি
নতুন ম্যানুয়ালে (Army New Dress Code) সেনা সদস্যদের ব্যক্তিগত সাজসজ্জা সম্পর্কেও বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
ট্যাটু ও বডি পিয়ার্সিং
- আগের মতোই ট্যাটু ও শরীরে পিয়ার্সিং নিষিদ্ধ।
- বাহিনীর শৃঙ্খলা ও একরূপতা বজায় রাখতেই এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে।
ব্রেসলেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
- ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় কোনও ধরনের ব্রেসলেট পরা যাবে না।
- শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার উপলক্ষে পরা পবিত্র সুতো ব্যবহার করা যাবে।
ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শনে নিয়ন্ত্রণ
- ইউনিফর্মের সঙ্গে ধর্মীয় প্রতীক বা চিহ্ন প্রদর্শন করা যাবে না।
- তবে শিখ সেনা সদস্যদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
গোঁফের দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট
- গোঁফের দৈর্ঘ্য সর্বাধিক ১২ সেন্টিমিটারের মধ্যে রাখতে হবে।
সুগন্ধি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
পুরনো অভ্যাস:
- অনেক ক্ষেত্রেই পারফিউম বা ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করা হত।
নতুন নির্দেশিকা:
- ইউনিফর্মে থাকা অবস্থায় ডিওডোরেন্ট ও পারফিউম ব্যবহার নিষিদ্ধ।
- শুধুমাত্র আফটারশেভ লোশন ব্যবহার করা যাবে।
মহিলা অফিসারদের জন্য নতুন নির্দেশিকা
মহিলা সেনা অফিসারদের (Army New Dress Code) পোশাক সম্পর্কেও বিস্তারিত নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুমোদিত পোশাক
- একরঙা শাড়ি
- কুর্তা-সালওয়ার
- সোজা কাটের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা প্যান্ট
নিষিদ্ধ পোশাক
- স্লিভলেস কুর্তা
- পালাজো
- সিগারেট প্যান্টসহ অন্যান্য ক্যাজুয়াল বটমওয়্যার
প্রসাধনী ব্যবহারে কড়াকড়ি
নতুন ম্যানুয়ালেও আগের নিষেধাজ্ঞাগুলি বহাল রাখা হয়েছে।
নিষিদ্ধ:
- লিপস্টিক
- রঙিন নেইলপলিশ
- টিপ
- নোজ পিন
অনুমোদিত:
- সিঁদুর ব্যবহার করা যাবে, তবে বেরেট বা পিকড ক্যাপ পরার পরও তা দৃশ্যমান থাকতে হবে।
ঔপনিবেশিক পরিভাষার অবসান
নতুন ম্যানুয়ালের অন্যতম বড় দিক হল ব্রিটিশ আমলের একাধিক শব্দ ও রীতির অপসারণ। ‘রয়্যাল’সহ বিভিন্ন ঔপনিবেশিক পরিভাষা বাদ দেওয়া হয়েছে।
অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভিপিএস কৌশিক জানিয়েছেন, (Army New Dress Code) এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যকে বজায় রেখেই ঔপনিবেশিকতার অবশিষ্ট চিহ্ন দূর করা এবং আধুনিক ভারতীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামরিক সংস্কৃতিকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘ডিকলোনাইজেশন’ বা ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্তকরণের আহ্বানের পর থেকেই সশস্ত্র বাহিনীতে দেশীয়করণ প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই ভারতীয় সেনার নতুন ইউনিফর্ম নীতি এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘অর্ডার, অর্ডার!’— বিচারকের চেয়ারে বসেই আদালতের কাজ, ‘ডিস্ট্রিক্ট জজ’ সেজে তোলপাড় বারাণসী কোর্ট











2 thoughts on “ঔপনিবেশিক ছাপ মুছতে ভারতীয় সেনার নতুন ড্রেস কোড, কী কী পরিবর্তন হলো?”