যত দিন যাচ্ছে বড় বড় শহরগুলিতে দূষণের পরিমাণ যেন বেড়েই চলেছে। দিনের শুরু হোক বা শেষ বিশুদ্ধ বাতাস এখন দুর্লভ। শহরের বাইরে গেলেও যে দূষণ থেকে মুক্তি মিলবে, এমন নয়। কিন্তু বেঁচে থাকতে নিঃশ্বাস তো নিতেই হবে। তাহলে উপায় কী? বাজারে এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এয়ার পিউরিফায়ার পাওয়া যায় বটে তবে তার দাম সকলের সাধ্যের মধ্যে নয়। এই সমস্যা থেকেই কম খরচে ইনডোর এয়ার পিউরিফায়ার তৈরির ভাবনা আসে IIT বম্বের-এর গবেষক রোহন কুমারের মাথায়। সেই ভাবনা থেকেই তিনি তৈরি করেন ‘Enviroforge Air Purifier’। কীভাবে তৈরি হলো এই এয়ার পিউরিফায়ার?
Enviroforge Air Purifier: দূষণের সঙ্গে পরিচয় থেকেই নতুন ভাবনা
বিহারে বড় হয়ে ওঠা রোহন গত কয়েক বছরে কাজের সূত্রে দিল্লি, গুজরাট, কর্নাটক ও মহারাষ্ট্রে থেকেছেন। বিভিন্ন শহরের বাতাসের মানের পার্থক্য খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। পরিবেশ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থেকেই ধীরে ধীরে ইনডোর এয়ার কোয়ালিটি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।
তবে তাঁর পরিবেশ নিয়ে কাজের শুরুটা এয়ার পিউরিফায়ার দিয়ে নয়। পরিবেশ প্রকৌশল নিয়ে গবেষণার সময় বর্জ্যজল শোধন এবং প্রাকৃতিক উপায়ে দূষণ কমানোর বিষয় নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই পরে বাতাস পরিষ্কারের প্রযুক্তি তৈরিতে কাজে লাগে।
শুরুটা হয়েছিল সাধারণ কার্ডবোর্ডের বাক্স দিয়ে
২০২৪ সালের শুরুতে পিউরিফায়ার তৈরির ভাবনা আসে রোহনের মাথায়। এরপর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। প্রথম মডেলটি ছিল একেবারেই সাধারণ—কার্ডবোর্ডের বাক্সের মধ্যে ফিল্টার বসিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেটি। একটি নকশা পছন্দ না হলে আরেকটি তৈরি করেছেন। কখনও অ্যামাজনের ডেলিভারি বক্স, কখনও ড্রাম ব্যবহার করে পরীক্ষা চলেছে। এভাবে প্রায় ৯-১০টি প্রোটোটাইপ তৈরির পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বর্তমান নকশাটি চূড়ান্ত করা হয়।
শুধু ফিল্টার নয়, রয়েছে প্রাকৃতিক উপাদানও
Enviroforge-কে সাধারণ এয়ার পিউরিফায়ারের থেকে আলাদা করার চেষ্টা করা হয়েছে এর উপকরণের মাধ্যমে। এতে বাঁশ, নারকেল, কলা, জুট, মসলিন, তুলো ও সিল্কের মতো প্রাকৃতিক ফাইবার ব্যবহার করা হয়েছে। মোটা ফাইবার অপেক্ষাকৃত বড় ধুলোকণা আটকে দেয়, আর সূক্ষ্ম ফাইবার PM2.5 ও PM10-এর মতো ছোট কণা ধরতে সাহায্য করে।
গ্যাসীয় দূষণ কমানোর জন্য রয়েছে অ্যাক্টিভেটেড কার্বন, বায়োচার, জিওলাইট, সেরামিক ফিল্টার, ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড ও লাইম। এর পাশাপাশি স্নেক প্ল্যান্ট, মানি প্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট, পিস লিলি ও মসের মতো গাছ এবং কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়াও এই ব্যবস্থার অংশ।
রোহনের দাবি, এই সবকিছুকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়েই তৈরি হয়েছে একটি হাইব্রিড বায়োফিজিক্যাল এয়ার পিউরিফিকেশন ব্যবস্থা।
২০ মিনিটেই ৮০ শতাংশ AQI কমার দাবি
রোহনের করা পরীক্ষায় ৮০০ ঘনফুটের একটি বন্ধ ঘরে মাত্র ২০ মিনিটে AQI (Air Quality Index) ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর পরীক্ষার ফল অনুযায়ী PM10 প্রায় ৯২ শতাংশ এবং PM2.5 প্রায় ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। গ্যাসীয় দূষণও প্রায় ৮০ শতাংশ কমানোর ফল পাওয়া গিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এই ফলাফল নিয়ে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। পরীক্ষাগুলি এখনও কোনও স্বাধীন NABL-স্বীকৃত ল্যাবরেটরিতে যাচাই বা সার্টিফায়েড হয়নি। ফলে এই পরিসংখ্যানগুলিকে আপাতত নির্মাতার নিজস্ব পরীক্ষার ফল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। (Enviroforge Air Purifier)
রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যোগ, ট্রাকের পিছনে কেন ‘Horn OK Please’ লেখা থাকে?
দামও রাখতে চান সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে
রোহনের পরিকল্পনা শুধু প্রযুক্তি তৈরি করেই থেমে থাকা নয়। সাধারণ পরিবার, পড়ুয়া, ছোট ব্যবসা এবং কম আয়ের মানুষের কাছেও যাতে এটি পৌঁছতে পারে, সেই লক্ষ্যেই দাম তুলনামূলক কম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সবচেয়ে সস্তা মডেলের দাম প্রায় ২,০০০ টাকা থেকে শুরু হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। মাঝারি মডেলের দাম ৫,০০০-৬,০০০ টাকা এবং প্রিমিয়াম মডেলের দাম প্রায় ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
ইতিমধ্যেই তাঁর এই আবিষ্কারের প্রায় ২৫টি ইউনিট বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। দিল্লি, আহমেদাবাদ, বেঙ্গালুরু ও সুরাটেও কিছু ইউনিট পাঠানো হয়েছে। বাড়ি ও অফিসের পাশাপাশি রাস্তা, নির্মাণস্থলের কাছাকাছি এলাকা এবং রাসায়নিক পরীক্ষাগারেও এগুলির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। চলতি বছরে ডিসেম্বরে এই আর পিউরিফায়ার বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তার আগে বিভিন্ন পরিবেশ ও ঋতুতে আরও পরীক্ষা চালিয়ে পিউরিফায়ারটিকে উন্নত করার কাজ চলছে।
সব ঠিকঠাক থাকলে, খুব তাড়াতাড়ি বাজারে আসতে চলেছে তুলনামুলকভাবে সস্তা এই এয়ার পিউরিফায়ার। এতে মধ্যবিত্তের পকেটে চাপ যেমন কমবে তেমনই মিলবে বিশুদ্ধ বাতাসও।








