শরৎ এলেই বদলে যায় বাংলার পরিবেশ। আকাশে মেঘের ভেলা, মাঠজুড়ে কাশফুল আর বাতাসে শিউলির গন্ধ জানান দেয়, উমার আগমনের সময় হয়ে এসেছে। ঢাকের বাদ্যি, পুজোর প্রস্তুতি আর উৎসবের আবহে ধীরে ধীরে শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা। তবে এই পুজোর সঙ্গে এমন একটি গাছ জড়িয়ে রয়েছে, যার মাহাত্ম্য বহু পুরনো। সেটি হলো বেলগাছ।
দুর্গাপুজোর শুরুতেই বেলগাছের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেলতলায় দেবীর বোধন, অধিবাস ও আমন্ত্রণের রীতি বহুদিনের। কিন্তু কেন দুর্গাপুজোর সঙ্গে বেলগাছের এই সম্পর্ক? এর পিছনে রয়েছে পুরাণের এক সুন্দর কাহিনি।
Durga Puja: দেবতাদের ঘুমের সময়েই রামের অকালবোধন
সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবলোক ও মর্ত্যলোকের সময়ের হিসেব এক নয়। মানুষের এক বছর দেবতাদের কাছে মাত্র একটি অহোরাত্র। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছয় মাসকে দেবতাদের দিন এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ পর্যন্ত ছয় মাসকে তাঁদের রাত হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ে দেবতারা নিদ্রায় থাকেন।
প্রাচীন নিয়ম অনুযায়ী মহামায়ার আরাধনা করা হত বসন্তকালে, যখন দেবতারা জাগ্রত থাকেন। কিন্তু লঙ্কা জয়ের আগে শরৎকালের আশ্বিন মাসে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। সেই সময় দেবতাদের ছিল নিদ্রার কাল। তাই ঘুমন্ত দেবীকে অসময়ে জাগিয়ে তাঁর পুজো করার এই প্রচেষ্টাই পরিচিত হয় ‘অকালবোধন’ নামে। আর শরৎকালে হওয়া এই দুর্গাপুজো পরিচিত হয় ‘শারদীয়া’ নামে।
বেলগাছের নীচেই দেবীর দেখা পেলেন ব্রহ্মা
নিদ্রিত মহাশক্তিকে জাগিয়ে তোলা সহজ ছিল না। দেবীকে জাগ্রত করার জন্য শ্রীরামচন্দ্র প্রথমে ব্রহ্মার কাছে দেবীস্তুতি পাঠ করেন। রামের আকুল প্রার্থনায় ব্রহ্মা ধ্যানে বসেন। সেই ধ্যানের মধ্যেই তিনি এক অলৌকিক দৃশ্য দেখতে পান।ব্রহ্মার ধ্যানে দেখা যায়, সমুদ্রের তটে পুজোয় বসেছেন শ্রীরামচন্দ্র। সেই সৈকত পেরিয়ে সামনে রয়েছে গভীর এক অরণ্য। সেখানে একটি বেলগাছের নীচে খেলছে আট-দশ বছরের এক অপরূপ বালিকা। ব্রহ্মা বুঝতে পারেন, এই বালিকাই আসলে সাক্ষাৎ গৌরী বা দেবীশক্তি।
আম্বানিদের গণেশ পুজোয় এক ফ্রেমে শাহরুখ-রণবীর, নেট দুনিয়ায় ভাইরাল ছবি
কিন্তু ব্রহ্মার দৃষ্টি পড়তেই সেই বালিকা হঠাৎ বেলগাছের পাতার আড়ালে মিলিয়ে যান। এই ঘটনাকেই বেলগাছের মাহাত্ম্যের সঙ্গে জুড়ে দেখা হয়।
এরপর ব্রহ্মা নির্দেশ দেন, মর্ত্যে দেবীর অধিবাস ও বোধন করতে হবে শ্রীফল বা বেলগাছের তলদেশে। কারণ, তাঁর আহ্বানে দেবী প্রথম প্রকাশ পেয়েছিলেন বেলপাতার আড়ালে কুমারী কন্যারূপে। (Durga Puja)
সেই পৌরাণিক স্মৃতিকে সামনে রেখেই আজও দুর্গাপুজোর সূচনায় বেলগাছের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেলতলায় সংকল্প, বোধন, অধিবাস ও আমন্ত্রণের মাধ্যমে দেবীকে পুজোয় আহ্বান করা হয়। অনেক জায়গায় আস্ত বেলগাছের পরিবর্তে তার একটি কচি ডালও নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বিশ্বাস অনুযায়ী, বেলতলায় প্রথম আশ্রয় নেওয়ার পর দেবীকে পূজা মণ্ডপে নিয়ে আসা হয়। বেলগাছকে ঘিরে থাকা এই বিশ্বাস ও রীতির মধ্যেই আজও বেঁচে রয়েছে অকালবোধনের সেই প্রাচীন কাহিনি।












