দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে উঠবে প্রদীপের আলো। সেই রাতেই আরাধনা করা হবে শ্যামার। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে দীপান্বিতা অমাবস্যা উপলক্ষে আগামী ৮ নভেম্বর, রবিবার পালিত হবে কালীপুজো। সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৮ নভেম্বর সকাল ১০টা ৪৬ মিনিটে অমাবস্যা তিথি শুরু হবে। তা থাকবে ৯ নভেম্বর, সোমবার সকাল ১১টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত। ৮ নভেম্বর রাত ১০টা ৫৬ মিনিট থেকে ১১টা ৪৪ মিনিটের মধ্যে শ্যামাপুজোর সময় নির্ধারিত হয়েছে। তবে স্থানভেদে সময়ের কিছু পরিবর্তন হতে পারে। (Kali Puja)
অশুভ বিনাশিনী দেবী কালী
কালী শক্তি উপাসকদের কাছে আদ্যাশক্তির প্রতীক। দশমহাবিদ্যার মধ্যে তিনিই প্রথম মহাবিদ্যা। একদিকে তাঁর রূপে রয়েছে মমতা ও করুণার প্রকাশ, অন্যদিকে অশুভ শক্তির বিনাশে তিনি ভয়ঙ্করী। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, দেবাসুরের যুদ্ধের সময় আদ্যাশক্তি মহামায়ার শরীর থেকে কৌশিকীর আবির্ভাব হয়। সেই সময় মহামায়া কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেন। তিনিই কালী। তাঁর রূপ অন্ধকারের প্রতীক হলেও তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ করে আলোর পথ দেখান। মূর্তির চার হাতের মধ্যে বাম হাতে থাকে খড়্গ ও মুণ্ড। ডান হাতে থাকে বরাভয় মুদ্রা। গলায় নরমুণ্ডের মালা, মুক্তকেশী রূপ এবং শিবের বুকে অবস্থান তাঁর প্রতিমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই রূপের মধ্যেই ধ্বংস ও সৃষ্টির দুই বিপরীত ভাব ফুটে ওঠে। (Kali Puja)
কীভাবে তৈরি হল বাঙালির শ্যামামূর্তি?
কথিত, নবদ্বীপের তান্ত্রিক সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ সারারাত সাধনা করেও দেবীর দর্শন পাননি। ভোরে গঙ্গাস্নানে যাওয়ার পথে তিনি এক গোয়ালিনিকে দেওয়ালে ঘুঁটে দিতে দেখেন। সামনে পুরুষ মানুষকে দেখে লজ্জায় ওই মহিলা জিভ কাটেন। এক হাতে গোবর নিয়ে কাঠের পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সেই দৃশ্যের মধ্যেই আগমবাগীশ নিজের আরাধ্যা রূপ খুঁজে পান। বাড়ি ফিরে সেই আদলেই তৈরি করেন কালীর মূর্তি। শিবের বুকে দাঁড়ানো, এক হাতে বরাভয় মুদ্রায় দেখানো হয়। কালীপুজোর পদ্ধতি নিয়েও তিনি ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’ গ্রন্থ রচনা করেন বলে প্রচলিত রয়েছে।
বাংলায় কালীপুজোর প্রসার
আগে মূলত শ্মশান,নদীর তীর ও গভীর অরণ্যে কালীপুজো হত। উপাসকরা তামার পাতে এঁকে বা খোদাই করে পুজো করতেন। পরবর্তী সময়ে কালীমূর্তির মাধ্যমে পুজোর প্রচলন বাড়ে। ষোড়শ শতাব্দীতে নবদ্বীপের পণ্ডিত রঘুনন্দন দীপান্বিতা অমাবস্যায় লক্ষ্মীপুজোর বিধান দিলেও কালীপুজোর উল্লেখ করেননি। পরে কাশীনাথ কার্তিকী অমাবস্যায় দীপাবলির সময় কালীপুজোর মন্ত্র ও পদ্ধতি সহজভাবে প্রচার করেন। ১৭৬০ সাল নাগাদ তাঁর লেখা পুজোর পদ্ধতি পরিচিতি পায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের আমলে বাংলায় কালীপুজো আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সময় রামপ্রসাদ সেনও আগমবাগীশের পদ্ধতি অনুসারে কালীপুজো করতেন বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র কয়েকজন ধনী জমিদারকে সঙ্গে নিয়ে কালীপুজোর আয়োজন করেন। ধীরে ধীরে সেই পুজো ছড়িয়ে পড়ে। একসময়ের শ্মশানবাসিনী কালী আজ বাঙালির ঘরে ঘরে শ্যামা রূপে পূজিত হন। দুর্গাপুজোর মতোই কালীপুজোও হয়ে উঠেছে বাংলার অন্যতম বড় উৎসব। (Kali Puja)











