কুশল চক্রবর্তী
ঝুলি থেকে আবার বিড়াল বেরিয়ে পড়ল। ভারতীয় ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার প্রায় সব ব্যাঙ্ক মিলিয়ে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অবধি গ্রাহকের কাছ থেকে ১৯০০০ কোটি টাকা কেটে নিয়েছে তার অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম টাকা না রাখার জরিমানস্বরূপ (Bank Penalty Income)। এই যে ১৯০০০ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে, তার মধ্যে HDFC ব্যাঙ্ক, Axis ব্যাঙ্ক আর আর ICICI ব্যাঙ্কের মিলিত সংগ্রহ ৭৭০৩ কোটি টাকা। মোটামুটি ৩৩টি ভারতীয় বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের মধ্যে এই তিনটি ব্যাঙ্কই পুরো জরিমানারা টাকার প্রায় ৩৫ শতাংশ পকেটস্থ করেছে।
কিন্তু দেখা যাক এই সব ব্যাঙ্ক ভারতের সাধারন মানুষকে কতটা পরিষেবা দেয়। বিগত ১২ বছরে ভারত সরকারের নীতি অনুসারে সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাঙ্কে যে ৫৬ কোটি “জন ধন” অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে তার খুব বেশি হলে ৫-৬ শতাংশ অ্যাকাউন্ট এই সব ব্যাঙ্ক খুলেছে। এই সব ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে যে পরিমাণ ন্যূনতম টাকা অ্যাকাউন্টে রাখার কথা বলা হচ্ছে তা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছে ভাবাই যায় না।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর অন্যতম কাজ হচ্ছে দেশের গরিবদের উন্নয়নে নানা কাজ করা। যেমন তাদের সমগ্র ধারের প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে, ছোট ও মাঝারি শিল্পে আরও কয়েকটা অপেক্ষাকৃত উন্নয়নশীল শিল্পে ধার দিতে হয়। এমনকি কোনও কোনও ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হারও থাকে কম। এই সব ধার থেকে লাভ করার আশাও থাকে কম। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে এসব কাজ করতে হয় দেশের উন্নয়নের কথা মনে রেখে। কিন্তু এই সব প্রাইভেট ব্যাঙ্ক এসব কাজে কতটা নিজেদের নিয়েজিত করে তা নিয়ে চিন্তা থেকেই যায়। কিছুদিন আগেই ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এরকমই একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কের কৃষিক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার পদ্ধতিতে নানা রকম নিয়ম বহির্ভূত কাজের কথা বলে তাদের কাজের সংশোধন করতে বলে।
জ্বালানি সংকটে নাজেহাল বাংলাদেশ, প্রতিবেশিকে বাঁচাতে ৫০০০ টন ডিজেল পাঠাচ্ছে ভারত
কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার ২০২১ সাল থেকে এই সব প্রাইভেট ব্যাঙ্ককে সরকারি প্রায় সবরকমের কাজ করবার অধিকার দেয়। অর্থাৎ কিনা এতদিন ধরে যে কাজগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত বাঙ্কগুলোই করত, তাও চলে আসে তাদের হাতে। অন্য দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো বহুদিন ধরেই ভারতীয় অর্থনীতিতে মানুষের চাকরির সুযোগ তৈরি করার একটা বিরাট জায়গা। প্রতি বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো প্রচুর মানুষকে তার যোগ্যতা অনুসারে চাকরির ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে। অথচ দেখুন ২০২৫ সালে HDFC ব্যাঙ্ক চাকরি দিয়েছে মাত্র ৯৯৪ জনকে আর ICICI ব্যাঙ্ক চাকরি থেকে বিদায় জানিয়েছে ৬৭২৩ জনকে। অথচ এই দুই ব্যাঙ্কের ব্যবসা এই কয়েক বছরে
বেড়েছে কয়েকগুন।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এই যে ন্যূনতম ব্যালেন্সের অভাবে টাকা কাটা নিয়ে নানা কথা ওঠায় ভারতের সব বৃহৎ ব্যাঙ্ক ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া অনেকদিন আগেই তাদের সেভিংস অ্যাকাউন্টে আর ন্যূনতম টাকার রাখার ব্যাপারটা তুলে দিয়েছে। এরপর আরও নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, গ্রাহকের সেভিংস অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম টাকা রাখার ব্যাপারটা তুলে দেবে বলে সিদ্ধান্তও নিয়েছে। তার মধ্যে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক আর কানাডা ব্যাঙ্ক অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। অন্যদিকে HDFC, ICICI ব্যাঙ্কের মতো কিছু প্রাইভেট ব্যাঙ্ক, তাঁরা এই জরিমানার পরিমাণটা আরও বাড়িয়ে দিতে চাইছে।
গৃহস্থের মাথায় হাত, ২১ নয়, আরও দেরিতে করতে হবে গ্যাস বুকিং
মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে, প্রাইভেট ব্যাঙ্কের এই যে ১১০০০ কোটি টাকার মতো আয় সেই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য কিছু উঠে আসেনি। কিন্তু উনি বলেছেন, “এই যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো তাদের অ্যাকাউন্টে কম টাকা রাখার জন্য জরিমানা স্বরূপ ৮০৯৩ কোটি টাকা আদায় করল, তা তো তাদের সমগ্র লাভের ০.২ শতাংশ মাত্র। এই ব্যাঙ্কগুলো তাদের গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট পরিচর্যার জন্য যে খরচ করে তার হয়ত কিছুটা তারা নিয়েছে। তারা যে তাদের লাভের আশায় যে কাজটা করেনি তা তো বলা যেতেই পারে।”
অথচ সুদের টাকায় মাস চলা বিধবা বৃদ্ধা, চাকরিহীন বেকার ভাতা প্রাপ্ত মানুষ, চুক্তিভিত্তিক সামান্য আয়ের শ্রমজীবী মানুষ বা অধুনা গিগ কর্মচারী তাদের কথা কে আর ভাবে। তাদের কাছে পূর্ণিমার চাঁদ তো ঝলসানো রুটিই হয়ে ওঠে।













1 thought on “Bank Penalty Income: জরিমানা নিয়েই ১৯ হাজার কোটি টাকা ঘরে তুলল ব্যাঙ্কগুলো”