কুশল চক্রবর্তী
অবশেষে ঝুলি থেকে বেড়াল বেড়িয়েই পড়ল। প্রস্তাব আর প্রতিবাদ চলছিল অনেক দিন ধরেই, কিন্তু মনে হচ্ছে আর আটকানো গেল না। (SBI Kolkata Office Relocation) ভারতীয় ষ্টেট ব্যাঙ্কের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ কলকাতা থেকে তুলে নেওয়ার ব্যপারটা মনে হচ্ছে যেন পাকাপকিভাবে অনতিবিলম্বেই হতে যাচ্ছে। ভারতের সর্ববৃহৎ ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্কের চেকের মাধ্যমে লেনদেন সংক্রান্ত কাজে লিপ্ত CCPC (সেন্ট্রাল চেক প্রোসেসিং সেন্টার), নতুন অ্যাকাউন্ট আর নতুন চেক বই দেওয়ার বিভাগ, LCPC (লায়াবিলিটি সেন্ট্রাল প্রোসেসিং সেন্টার), আর অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন দেখাশোনার বিভাগ CPPC (সেন্ট্রাল পেনশন প্রোসেসিং সেন্টার) এবার কলকাতা থেকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটা বলতে গেলে নিশ্চিত হয়েই গেল।
এই তিনটি বিভাগ কলকাতা থেকে চলে গেলে হয়তো ২০০-র মতো ষ্টেট ব্যাঙ্কের স্থায়ী কর্মচারী স্থানান্তরিত হবেন এখন। আর আগামীদিনে আরও সঙ্কুচিত হবে কলকাতায় ষ্টেট ব্যাঙ্কের চাকরির পরিসর। এছাড়াও এই দপ্তরগুলোতে এখন যারা কাজ করছেন তাঁদের এখন চাকরি না গেলেও, যেখানে এখন স্থানান্তারিত হলেন সেখানে এদের চলে যাওয়ার পর আর লোক নেওয়া হবে না। অর্থাৎ কি না প্রায় ৪০০ লোকের ষ্টেট ব্যাঙ্কের বেঙ্গল সার্কেলে চাকরি হওয়ার সুযোগ হয়তো কমে গেল। (SBI Kolkata Office Relocation)
আরও পড়ুন: টাকা জমা রাখতে গিয়ে নয়-ছয়, HDFC-র ঘটনা অনেক প্রশ্ন তুলে দিল
এই অফিসগুলোকে ভিত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করে অন্তত পরিবার সহ ৫০০ লোক। তাদের রুজি রোজগারের অন্য পথ খুঁজতে হবে। অন্যদিকে গ্রাহকের অবস্থা ভেবে দেখুন। ধরা যাক, কোনও এক ব্যক্তি একটা অ্যাকাউন্ট খুলেছে একটি ব্যাঙ্কের শাখায়। যে কোনও কারণেই হোক তাঁর অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত কোনও অসুবিধা দেখা দিলে, গ্রাহককে ফোন করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হয় ব্যাঙ্কের আধিকারিককে। অন্যথায় সেই ব্যাঙ্কের শাখা এগিয়ে আসে LCPC-কে সাহায্যের জন্য।
এই মুহূর্তে সাধারণ গ্রাহকরা অজানা নম্বর থেকে ফোন এলে তা ধরতে চান না। কারণ তাঁদের মনে প্রতিনিয়ত এখন ফোনের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার ভয় দেখা দিয়েছে। কলকাতায় এই দপ্তর থাকলে অনেক সহজেই সেই ব্যক্তিকে ধরার সুযোগ থাকে। ঠিক সেইরকমই এখন নিয়ম হয়েছে কোনও বেশি টাকার চেক লেনদেন করতে হলে অবশ্যই CPPC থেকে ফোন করে নিশ্চিন্ত হতে হবে যে অ্যাকাউন্টের অধিকারী এই চেকটা গ্রাহককে দিয়েছেন কি না। (SBI Kolkata Office Relocation)
ধরা যাক কোনও গ্রাহক ফোন ধরলেন না, তবে ব্যাঙ্কের আধিকারিক, গ্রাহকের ব্যাঙ্ককে বলবেন ওই গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর চেকের ব্যাপারে সম্মতি আদায় করতে, অন্যথায় তাঁর চেক ফেরত যেতে পারে। এই বিভাগ কলকাতায় থাকলে যত সহজে এই কাজটা করা সম্ভত তা কলকাতার বাইরে নিয়ে গেলে সম্ভব হবে কি? তারপর তো আছে ভাষা সমস্যা। বাংলার অনেক মানুষই তো এখনও হিন্দি বা ইংরাজি তেমনভাবে কথা বলতে পারেন না। অতএব এই বিভাগ কলকাতায় থাকলে ভাষা সমস্যা যত সহজে এড়ানো যেত তা অন্য রাজ্যে থাকলে সম্ভব নয়।
পেনশন নিয়ে তো সমস্যা অনেক বেশি গুরুতর। কারণ পেনশন যারা পান তাঁরা তো একেই প্রবীণ নাগরিক। তাঁদের বা তাঁদের স্ত্রীদের চলাফেরা করাই তো আরও কঠিন। আর ফোন যদি কোনও অচেনা নম্বর থেকে আসে তো তাঁরা তো ভয়েই আত্মারাম খাঁচাছাড়া। অতএব পেনশন গ্রহীতার কিছু হলে, সেই অ্যাকাউন্টের সমস্যা কলকাতা থেকেই মেটাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, অন্য কোথাও এই দপ্তর চলে গেলে তো কথাই নেই। (SBI Kolkata Office Relocation)
আরও পড়ুন: বাড়তে চলা জিনিসের দামে ব্যতিব্যস্ত মানুষ
পেনশন দপ্তর নিয়ে আরেকটা বড় সমস্যা হলো, এখন অনেক রাজ্য সরকার অনেকদিন পর বকেয়া ডিএ দিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পেনশন যিনি পেতেন, তিনি হয়তো গত হয়েছেন। এবং তাঁর স্ত্রী না থাকায় বা স্ত্রী বেঁচে না থাকায় তাঁর অ্যাকাউন্ট, তাঁর নমিনী অ্যাকাউন্ট হয়তো বন্ধ করে দিয়েছেন। এরকম অবস্থায় একদিকে যেমন নমিনি জানেন না যে তাঁর বাবা বা মা কিছু ন্যায্য টাকা এখনও সরকারের কাছ থেকে পান কি না, তেমন পেনশন দেওয়ার কর্তৃপক্ষ বকেয়া DA-র টাকা কোথায় পাঠাবেন তা ঠিক করতে পারেন না, কারণ তাঁর পেনশন অ্যাকাউন্ট তো আর নেই।
এমত অবস্থায় পেনশন গ্রাহকের শহরে যদি এই দপ্তর থাকলে নমিনির কিছুটা হলেও সুবিধা হয় টাকাটা জোগাড় করার। এছাড়াও নতুন চেক নেওয়ার ক্ষেত্রে কলকাতার গ্রাহকদের একটু বেশি সময় লাগার ব্যপারটা থাকতেই পারে।
কিছু অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক কর্মচারী মানুষ ও সুশীল সমাজের সংগঠন নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন, এই দপ্তর সরিয়ে নেওয়ার থেকে ষ্টেট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে বিরত করার জন্য। কিন্তু সেরকম কোনও উদ্যোগের চিহ্ন এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ ষ্টেট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ তাদের আভ্যন্তরীণ খরচ কমানোর জন্য ব্যাঙ্কের বিভিন্ন বিভাগ কেন্দ্রীয়করনের যে প্রয়াস নিয়েছেন তা তাঁরা বহাল রাখবেন বলেই মনে হয়। অন্যথায় ভারতীয় অর্থনীতির এই কঠিন সময়ে ব্যাঙ্কের লাভ বাড়ানো হয়তো কঠিন হবে। আর লাভ না বাড়লে, কেন্দ্রীয় সরকার কি খুব একটা খুশী হবেন? মনে তো হয় না। (SBI Kolkata Office Relocation)











