শ্যামাপুজোর রাতে দেবী কালীর আরাধনায় জবা ফুল, হোম-যজ্ঞ এবং নানা উপাচারের পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে কারণবারির। তান্ত্রিক পুজোয় এই কারণবারি বা মদ নিবেদনের প্রথা বহুদিনের। তবে সাধারণ গৃহস্থের কালীপুজোয় এই রীতির প্রচলন তেমন দেখা যায় না। মূলত তন্ত্র সাধনা এবং শ্মশান সাধনার ক্ষেত্রেই এর বিশেষ ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু দেবী কালীর পুজোয় কেন মদ নিবেদন করা হয়? এর পিছনে কি শুধুই ধর্মীয় রীতি, নাকি রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা? (Kali Puja Karana Bari)
পঞ্চ ‘ম’কারের অন্যতম উপাদান মদ্য
তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, শক্তি আরাধনার অন্যতম ভিত্তি হলো পঞ্চতত্ত্ব বা পঞ্চ ‘ম’কার। এই পাঁচটি উপাদান হলো মদ, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন। এর মধ্যে প্রথম উপাদানটিই হলো মদ বা কারণবারি। তন্ত্রসাধনায় এই উপাদানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মহানির্বাণ তন্ত্রে সুরা বা মদের বিভিন্ন প্রকারের উল্লেখ পাওয়া যায়। সাধকদের মতে, এটি সাধারণ পানীয় নয়। বরং সাধনার একটি বিশেষ উপকরণ। এর মাধ্যমে জাগতিক দুঃখ ও ভোগের বন্ধন থেকে মুক্তির প্রতীকী ভাবনা প্রকাশ পায়। তবে এর ব্যবহার শুধুমাত্র সাধনার উদ্দেশ্যেই নির্দিষ্ট।
ঋষি বশিষ্ঠের হাত ধরে বাংলায় প্রচলন
পৌরাণিক লোককথা অনুযায়ী, বাংলায় মদ সহযোগে তন্ত্রমতে পুজোর প্রচলন করেছিলেন ঋষি বশিষ্ঠ। দীর্ঘদিন তপস্যা করেও তিনি কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধি লাভ করতে পারেননি। পরে বিষ্ণুর নির্দেশে তিনি চিন বা তিব্বত অঞ্চলে যান। সেখানে পঞ্চ ‘ম’কার অনুসরণ করে তারা ও কালী সাধনার পদ্ধতি শেখেন। এরপর সেই বিশেষ সাধনাপদ্ধতি বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।
মদ নিবেদনের আসল অর্থ কী?
এই প্রথার পিছনে রয়েছে বিশেষ আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা। ‘আগমসার’ গ্রন্থে মদসাধনার অন্য অর্থের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে নির্গত অমৃতধারাকে পান করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই অমৃতধারা গ্রহণের মধ্য দিয়েই সাধক প্রকৃত আনন্দ লাভ করেন বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ, দেবীকে মদ্য নিবেদনের অর্থ শুধুমাত্র পানীয় অর্পণ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আত্মশুদ্ধির ভাবনা। সাধক নিজের ভিতরের অহংকার, ভয়, মোহ এবং নেতিবাচক প্রবৃত্তিগুলি দেবীর চরণে সমর্পণ করেন। তন্ত্রসাধনায় কারণবারির গুরুত্ব আসলে এই প্রতীকী অর্থের মধ্যেই নিহিত।











